মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। জ্বালানি তেলের রেশনিং, অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জাতীয় দিবসগুলোতে আলোকসজ্জা বাতিল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বন্ধ রাখার মতো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আজ রোববার এক প্রজ্ঞাপনে দেশের সকল জেলা প্রশাসককে (ডিসি) মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি, পাচার এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রির চেষ্টা করছে। এসব অপতৎপরতা রোধে মাঠ পর্যায়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আজ রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় আশ্বস্ত করে বলেন, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং কোনো সংকটের কারণ নেই। তবে যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত হওয়ায় সরকার সতর্কতামূলক অবস্থান হিসেবে ‘রেশনিং’ পদ্ধতি অবলম্বন করছে। তিনি আরও জানান, আজ সকালেই চট্টগ্রাম বন্দরে তেল ও গ্যাস নিয়ে জাহাজ নোঙর করতে শুরু করেছে এবং তেলের দাম বাড়ানোর আপাতত কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকার এ বছর পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং স্বাধীনতা দিবসের প্রথাগত আলোকসজ্জা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিশ্বব্যাপী উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশে যাতে জ্বালানি সংকট তৈরি না হয়, সেজন্যই এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জনভোগান্তি কমাতে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে আগামীকাল সোমবার (৯ মার্চ) থেকে ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হওয়া পর্যন্ত দেশের সকল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে সিলেটে এক সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জনগণকে সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যক্তিগতভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
জ্বালানি খাতের জন্য অন্যতম স্বস্তির খবর দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হওয়া ১৫টি জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, এসব জাহাজে প্রায় আড়াই লাখ টন এলএনজি, জ্বালানি তেল, এলপিজি এবং শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল রয়েছে। ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামের এলএনজি ট্যাংকারসহ অধিকাংশ জাহাজ নিরাপদে বন্দরে ভেড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে আজ পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। পরিদর্শনকালে মন্ত্রী জানান, দেশের টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এই প্রকল্পটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার খজিন এ সময় প্রকল্পের কারিগরি অগ্রগতির প্রশংসা করে জানান, এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
সার্বিকভাবে, সরকার বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান কৌশল।













