মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে চলমান অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর সরাসরি ধাক্কা এসে লাগছে বাংলাদেশের গায়ে। এই সম্ভাব্য মহাসংকট মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা নির্ধারণে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ এক জরুরি সভায় মিলিত হন।
শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এই সভায় অর্থনীতিবিদরা রিজার্ভ রক্ষা, জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প উৎস সন্ধান এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার না কমানোর মতো কঠোর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমানে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটি ১৯৮৩ সালে আগাম লেনদেন শুরুর পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক প্রবৃদ্ধি। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯৩ ডলারে উঠেছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের পর সর্বোচ্চ।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক তেলের বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এখন যুদ্ধাবস্থার কারণে অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ২০০-২৫০ কোটি টাকা বেড়ে যায়। এই হিসেবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম বেড়েছে ২৪ ডলার। ফলে ইতিমধ্যেই ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়ে গেছে।
বিকল্প উৎসের সন্ধান
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই নৌপথ বাধাগ্রস্ত হলে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির খরচ ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে সরকারের বাজেট ও ভর্তুকির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। এর প্রতিকারে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে তেল ও গ্যাস আনার পথ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রিজার্ভ সুরক্ষা ও বৈদেশিক সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৫.৪৯ বিলিয়ন ডলার (বিপিএম-৬ অনুযায়ী ৩০.৭৬ বিলিয়ন ডলার)। যদিও জানুয়ারিতে রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লে তা আবারও দ্রুত কমার শঙ্কা রয়েছে।
সভায় অর্থনীতিবিদরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, রিজার্ভের বর্তমান মজুতকে কোনোভাবেই সাধারণ আমদানির জন্য ব্যবহার করা যাবে না। পরিবর্তে তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বাড়তি ঋণের ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় করানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতি ঝুঁকি
বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামার শঙ্কা রয়েছে। এই ধাক্কা সামলাতে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও মসৃণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে এটি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা ভোক্তা পর্যায়ে চাপানো ঠিক হবে না। এর পরিবর্তে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।
নীতি সুদহার ও গভর্নরের বক্তব্য
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যোগ দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদহার কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আপাতত স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা মনে করেন, যুদ্ধের উত্তাপ না কমা পর্যন্ত সুদহার কমানো হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। উল্লেখ্য, এর আগে এক সদস্যের পদত্যাগ ও বিরোধিতার মুখে গভর্নরের সুদহার কমানোর সভাটি ভেস্তে গিয়েছিল।
সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমি সততার সঙ্গে কাজ করব এবং কোনো রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।” তিনি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেন।
সভায় ভুল তথ্য বা গুজবে যেন বাজারে আতঙ্ক তৈরি না হয়, সেজন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি নিয়মিত দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বিশ্লেষণ করবে এবং সময়মতো জনগণকে সঠিক তথ্য জানিয়ে আশ্বস্ত করবে।
সভায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।













