মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে দানা বেঁধেছে প্রবল উদ্বেগ। তবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শনিবার (৭ মার্চ) দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি তেলবাহী বিশাল জাহাজ বা ভেসেল এসে পৌঁছাবে। ফলে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো অবকাশ নেই।
সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও বাংলাদেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে সীমিত আকারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে ঠিকই, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশে তেলের অভাব আছে। বরং মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত তেল মজুত করার প্রবণতাই পরিস্থিতিকে কৃত্রিমভাবে জটিল করে তুলছে।”
জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা—তাড়াহুড়ো করে তেল কেনার বা সারারাত পাম্পে লাইন দিয়ে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারি নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের মাসিক চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি বর্তমানে পাইপলাইনে বা সমুদ্রে জাহাজে রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে বর্তমানে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুত রয়েছে এবং আরও অতিরিক্ত ১ লাখ টন আমদানির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। স্বস্তির বিষয় হলো, পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজস্ব উৎস থেকে উৎপাদিত এই দুই জ্বালানির কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আগামী ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলও বর্তমানে মজুত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, রণসাজ আর উত্তেজনার পারদ চড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ। আড়াই লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে এই জাহাজবহর এখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড়তে শুরু করেছে।
এই ১৫টি জাহাজের মধ্যে চারটিতেই রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি, যা মূলত কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে আনা হয়েছে। ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’-এর মতো বিশালাকায় এলএনজি ট্যাংকারগুলো বন্দরে পৌঁছানোর ফলে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটাই সচল থাকবে। তবে স্বস্তির মাঝে সামান্য উৎকণ্ঠা হয়ে এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকা পড়ে আছে ‘লিবারেল’ নামের আরেকটি জাহাজ। পরবর্তী চালানগুলো নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও বর্তমান সরবরাহ দেশের জ্বালানি ও শিল্প খাতের জন্য এক বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
কেবল শিল্প খাতের জ্বালানি নয়, গৃহস্থালি ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য জরুরি এলপিজি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েলের বড় একটি অংশও এসব জাহাজে করে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পোশাক শিল্প, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল এই বহরে থাকায় দেশের উৎপাদনমুখী খাতগুলোতে প্রাণসঞ্চার হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজগুলো থেকে দ্রুত পণ্য খালাস ও সারাদেশে তা নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও ইতিবাচক সংবাদ পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিবোঝাই একটি বড় ট্যাংকার বাংলাদেশের দিকে রওনা হয়েছে, যা আগামী ১৪ মার্চ বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকেও এলএনজি আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলেও বিকল্প উৎস হিসেবে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে সরকার।
অন্যদিকে, ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়েও আশার বাণী শুনিয়েছেন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। শনিবার বিকেলে কুমিল্লায় এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা চাপ থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমানে তেলের কোনো সংকট নেই। অন্তত এক মাসের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত রয়েছে এবং পরবর্তী চালানের জাহাজগুলোও ইতোমধ্যে সমুদ্রপথে রওনা দিয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মন্ত্রী মিতব্যয়িতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে আসন্ন ঈদ মৌসুমে বিপণিবিতানগুলোতে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
এর আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদেরাও দেশের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এমন আট অর্থনীতিবিদ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কোনোভাবেই অপচয় করা যাবে না। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে ব্রুনেই বা সিঙ্গাপুরের মতো বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর হয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বৈশ্বিক এই ধাক্কা সামলাতে হলে সরকারকে জনসমর্থন নিয়ে সংযম ও মিতব্যয়িতার পথে হাঁটতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে একাধিক গণমাধ্যম। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এদিন বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করেছেন। সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কিছু অসাধু চক্র তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে, যা কঠোরভাবে মনিটর করা হচ্ছে। নাগরিকদের প্রতি সরকারের অনুরোধ—প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবেন না।”
ইতিমধ্যে নাটোরে পানির ট্যাংকে অবৈধভাবে তেল মজুত করার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার এই বার্তাটিই জোরালোভাবে দিতে চাচ্ছে যে—সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত, এখন শুধু জনগণের ধীরস্থির ও স্বাভাবিক আচরণ প্রয়োজন।
সবমিলিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘সতর্কাবস্থায়’ আছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে শান্ত হয়ে যায়, তবে কোনো বড় সংকট হবে না। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুৎ সংকটের একটি বড় ঝুঁকি থেকেই যায়।
কারণ বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আর তাদের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিকল্প উৎস থেকে তেল আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হবে।
তাছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। এতে জ্বালানি আমদানির খরচ মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে বাংলাদেশ খোলা বাজার থেকেও এলএনজি কেনে। যুদ্ধের কারণে খোলা বাজারে দাম আকাশচুম্বী হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা লোডশেডিং বাড়িয়ে দেবে।













