পরাশক্তি সামলানোর কৌশল শেখাচ্ছে ঢাকা!

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বিশ্বরাজনীতির আকাশ যখন ঘন কালো মেঘে ঢাকা, ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সংঘাতের বিস্তৃতি আর পরাশক্তিগুলোর রণহুঙ্কার জনমনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অশুভ শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। ঠিক এই চরম অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি বাংলাদেশ এক অবিশ্বাস্য কূটনৈতিক মুন্সিয়ানা প্রদর্শন করছে।

রাজধানী ঢাকায় আজ ৪ মার্চ যে তৎপরতা দেখা গেছে, তা কেবল একটি নতুন সরকারের স্থায়িত্বের প্রমাণ নয়, বরং বেইজিং ও ওয়াশিংটনকে একই সমান্তরালে রেখে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের এক মাস্টারস্ট্রোক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার দেশীয় অগ্রাধিকার আর আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের যে খেলাটি খেলছে, তা সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন পাঠ্য হতে পারে।

আজকের দিনটির কেন্দ্রে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই শুরুর মুহূর্ত। বৈঠক শেষে ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ‘নির্বাচনটি ঘিরে ওয়াশিংটন যে প্রত্যাশা করেছিল, তার চেয়েও বেশি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হয়েছে। পল কাপুর আমাকে বলেছেন যে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এতটা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখরভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র অবাক হয়েছে।’ এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও তাঁর পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, ‘কিছু ভোটকেন্দ্রে মেলার মতো পরিবেশ ছিল।’

এই স্বীকৃতি কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া বার্তার ধারাবাহিকতা। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’ জন্য অভিনন্দন জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অংশীদারত্ব পারস্পরিক সম্মান এবং একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তিশালী ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।’

ট্রাম্পের চিঠিতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্য ‘উচ্চমানের আমেরিকান সরঞ্জামে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার’ বিষয়টি উল্লেখ থাকা ভবিষ্যতে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে ওয়াশিংটনের এই উষ্ণতার বিপরীতে বেইজিংও বসে নেই। বরং তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজেদের ‘দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া।

ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত কয়েকদিনে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। ইয়াও ওয়েন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, ‘কোনো বহিঃচাপ বা তৃতীয় পক্ষ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারবে না।’ তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিজয়।’

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। চীন কেবল কথাতেই সীমাবদ্ধ নয়; আজই বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সঙ্গে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (২৬৯ কোটি টাকা) একটি চুক্তি সই করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডেলিন বিউটি টেকনোলজি’। এতে চার হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

চীনের এই বিনিয়োগ বার্তা দিচ্ছে যে, তারা নতুন সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠকেও ইয়াও ওয়েন স্পষ্ট করেছেন যে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফলে চীন সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে।’

এই ভারসাম্য রক্ষার লড়াইয়ের সমান্তরালে সরকারকে লড়তে হচ্ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা থেকে উদ্ভূত সংকটগুলোর সঙ্গেও। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত কেবল তেলের দাম বাড়ায়নি, বরং সরবরাহ চেইনকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আজ পল কাপুরের কাছে সরাসরি জ্বালানি সহায়তা চেয়েছেন।

মন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খুঁজছে।’ তিনি দেশবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘শপিংমল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করতে হবে’ এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

জ্বালানি পাচার রোধে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) দেওয়া নির্দেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।

বাণিজ্যিক ফ্রন্টেও বিএনপি সরকার অত্যন্ত সজাগ। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চীনা ও মার্কিন—উভয় প্রতিনিধিদের সাথেই অত্যন্ত কৌশলী আলোচনা সেরেছেন। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাথে বৈঠকে তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল এবং গ্যাসের অভাবে ধুঁকতে থাকা ছয়টি সার কারখানায় চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এলএনজি আমদানি করে সার কারখানা চালু করতে পারে এমন বিনিয়োগকারী খুঁজছি আমরা, উৎপাদিত সার সরকার কিনে নেবে।’

আবার পল কাপুরের সঙ্গে আজকের বৈঠকে তিনি মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষায়, ‘কোনো চুক্তিই চূড়ান্ত নয়, প্রতিটি চুক্তিতে সংশোধন ও পুনরায় আলোচনার সুযোগ থাকে।’ অর্থাৎ, নতুন সরকার কারো কাছে নতি স্বীকার না করে জাতীয় স্বার্থকে দরকষাকষির মূল হাতিয়ার করছে।

এই পুরো কূটনৈতিক তৎপরতার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির যেমনটি সম্প্রতি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই এই সুদৃঢ় সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল।’ বেইজিংও বারবার সেই ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করছে। আবার ওয়াশিংটন যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে কথা বলে, তখন তারা বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের মাঝে এক নির্ভরযোগ্য অংশীদারকে খুঁজে পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে চীনের রাষ্ট্রদূত তাঁকে বেইজিং সফরের উষ্ণ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, অন্যদিকে ওয়াশিংটন প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য নিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনেকগুলো ‘ডোমেস্টিক প্রায়োরিটি’ বা অভ্যন্তরীণ কাজ গোছানো শেষ হলে তিনি বিদেশ সফরের পরিকল্পনা করবেন এবং চীনের আমন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।

সার্বিকভাবে, সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর, যিনি গত বছর শপথ নেওয়ার আগে নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, তাঁর এই সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে আগের চেয়েও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পল কাপুর নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’-এর বিধানসমূহ বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটিও উঠে আসে, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং একটি টেকসই সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্র যখন গণতন্ত্র আর নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত হচ্ছে, চীন তখন ব্যস্ত বাংলাদেশের মাটিতে নিজেদের বিনিয়োগের অঙ্ককে পাহাড়সম করতে। সাম্প্রতিক দুটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। আজকের আগে ২ মার্চও চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন পিউর হাউসওয়্যার’ বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩০.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা) বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। এই কারখানায় উৎপাদিত হবে মাটিবিহীন চাষাবাদের বিশেষায়িত ‘হাইড্রোপনিক্স টেন্ট’, যা বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য। এর মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হবে।

অর্থাৎ মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে চীন ও হংকং থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫২.৫ মিলিয়ন ডলার বা ৬০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত হলো।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই মার্চ মাস বাংলাদেশের কূটনীতির ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন পরাশক্তিদের রেষারেষিতে পক্ষ না নিয়ে বরং নিজের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে প্রাধান্য দেওয়া—এটাই হচ্ছে বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ডকট্রিন।

ওয়াশিংটন ও বেইজিংকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেওয়ার এই কৌশল যদি সফল হয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকার অবস্থানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ভাষায় ভোটকেন্দ্রে যে ‘মেলার মতো পরিবেশ’ ছিল, সেই উৎসবের আমেজ এখন সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন—সবখানেই অনুভূত হচ্ছে এক আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top