বাংলাদেশের অর্থনীতির চিরন্তন চালিকাশক্তি কৃষি খাতকে ঘিরে এক সুদূরপ্রসারী ও আধুনিক সংস্কারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। শপথের পরদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে আজ (২৩ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায় এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, আগামীর বাংলাদেশ হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত এক আধুনিক কৃষির দেশ। এই পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’, যার মূলে রয়েছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া ‘সবুজ বিপ্লব’-এর অঙ্গীকার।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘কৃষক কার্ড’ বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাটি ছিল সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি কৃষকের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্মার্ট কার্ড চালুর নির্দেশ দেন। এটি গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সরাসরি প্রতিফলন। ইশতেহার ঘোষণাকালে তারেক রহমান অঙ্গীকার করেছিলেন, “কৃষক ও কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।” তার আগে নওগাঁর জনসভায় (২৯ জানুয়ারি) তিনি বলেছিলেন, “কৃষকদের ভালো রাখতে পারলেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হবে। কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে।”
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আজকের সভা শেষে জানান, এই পদ্ধতির ফলে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। মন্ত্রীর ভাষায়, “একজন মোবাইল সিম ক্রেতা যেমন সরাসরি সেবা পান, তেমনি এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। স্মার্ট পদ্ধতিতে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, উৎপাদনের পূর্বাভাস ও আবহাওয়ার বার্তা কৃষকের হাতের নাগালে চলে আসবে।” মন্ত্রী আরও জানান, এটি কেবল একটি প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং রাষ্ট্র ও কৃষকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি সেতু।
সরকারের এই নতুন কর্মযজ্ঞের গতির সঞ্চার হয়েছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই। সেদিন সচিবালয়ে নিজের প্রথম কার্যদিবসে নবনিযুক্ত কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ‘কৃষক কার্ড’ বণ্টনের কাজ দ্রুত শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “কৃষক কার্ড কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রান্তিক পর্যায়ে বণ্টন শুরু করা যায়, সেটিই হবে আমার প্রাথমিক কাজের কেন্দ্রবিন্দু।” প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা প্রথমবারের মতো আধুনিক কৃষিবিমার সুবিধা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। স্বচ্ছতার স্বার্থে একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময়কালে প্রতিমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, ৫ আগস্টের পর দেশের মানুষ আর কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা বৈষম্য দেখতে চায় না। তিনি জানান, দেশের খাল-বিল ও জলাশয়সমূহ পুনরুদ্ধার করে মৎস্য সম্পদের ভাণ্ডার রক্ষা করা হবে। সরকার বিশ্বাস করে, দেশের ৭০ ভাগ মানুষ যে পেশার সাথে জড়িত, সেই কৃষিখাত শক্তিশালী হলে বাকি ৩০ ভাগ মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি এমনিতেই শক্ত হবে।
কৃষিমন্ত্রীর লক্ষ্য: অর্গানিক কৃষি ও রপ্তানি বিপ্লব
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন উর রশীদ এই পরিবর্তনের চিত্রপটকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছেন। নিজের বক্তব্যে তিনি কৃষিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন, “আগামী এক বছরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে কৃষি পণ্য রপ্তানি করা হবে।” ২১ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে মন্ত্রী নিজেকে একজন কৃষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, “আমি সরকারি বেতন-ভাতা নেই না, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করি না। কুমিল্লার ‘আখতার হামিদ খান মডেল’ অনুসরণ করে সারাদেশে কৃষি উন্নয়নের কাজ করা হবে।”
২২ ফেব্রুয়ারি তিনি চরাঞ্চলে ‘অর্গানিক কৃষি’ বা জৈব চাষাবাদের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, রপ্তানি বাড়াতে হলে মাটির গুণাগুণ রক্ষা করে বিষমুক্ত ফসল ফলাতে হবে। সরকার আগামী এক বছরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই দিনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে পরিচিতি সভায় মন্ত্রী বলেন, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক ইশতেহার অনুযায়ী, সাধারণ কৃষকদের স্বস্তি দিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এছাড়া ২৬ জানুয়ারি কাঁচপুরের রোডশোতে তারেক রহমান ঘোষিত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় চালুর ঘোষণা এখন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের পথে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সাধারণ কৃষকদের মনে এই বিশ্বাস জাগাচ্ছে যে, আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার এই লড়াইয়ে তারা আর পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠী নয়, বরং অগ্রযাত্রার মূল কারিগর।













