কেন টয়োটা–নাভানার ৬০ বছরের সম্পর্কে ভাঙন?

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে টয়োটার দীর্ঘ ছয় দশকের পথচলায় এক নজিরবিহীন আইনি সংকট তৈরি হয়েছে। দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান নাভানা লিমিটেডের ব্যবসায়িক ক্ষতিসাধনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় টয়োটার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় নাগরিক ও নবগঠিত ‘টয়োটা বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রেমিত সিং। অন্য দুই অভিযুক্ত হলেন—জাপানি নাগরিক ও টয়োটা সুশো এশিয়া প্যাসিফিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট আকিও ওগাওয়া এবং টয়োটা সুশো কর্পোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার আসিফ রহমান।

ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত ৮ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পিবিআই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন আসামি পরস্পর যোগসাজশে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা করেছেন। অভিন্ন উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাভানার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছেন—এমন প্রাথমিক প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।

নাভানা লিমিটেডের পক্ষে শফিউল ইসলাম চলতি বছরের ৯ জুলাই আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, নাভানা লিমিটেড ১৯৬৪ সাল থেকে বাংলাদেশে টয়োটার একক পরিবেশক হিসেবে কাজ করে আসছে। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে নাভানার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও পক্ষপাতদুষ্ট বাজার প্রতিবেদন তৈরি করে টয়োটা সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন। এর ফলে নাভানার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মামলাটির তদন্ত করেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক এবং তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান। তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা গ্রাহকদের অর্ডার করা গাড়ি উৎপাদনে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব ঘটিয়েছেন।

এ ছাড়া কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যানুফ্যাকচারার ইনভয়েস’ সরবরাহ না করে নাভানাকে আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জরিমানার ঝুঁকিতে ফেলেছেন তারা। তদন্তে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল নাভানাকে সরিয়ে নতুন কোনো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে টয়োটার ব্যবসা স্থানান্তর করা।

পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪১৭ (প্রতারণা) এবং ৩৪ (অভিন্ন উদ্দেশ্য) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সুপারিশ করেছে। আদালত মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩০ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেছেন। সেদিনই সিদ্ধান্ত হবে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু হবে কি না।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী নাভানা গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিষ্ঠান নাভানা লিমিটেড প্রায় ৬০ বছর ধরে টয়োটা মোটর কর্পোরেশনের ব্যবসায়িক অংশীদার। ১৯৬৪ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশে টয়োটার একক পরিবেশক হিসেবে তাদের যাত্রা শুরু হয়। দেশের জাপানি অটোমোবাইল বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ এই প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে, টয়োটা সুশো কর্পোরেশন টয়োটা গ্রুপের একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক শাখা। সম্প্রতি তারা বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয়, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, এই নতুন কাঠামোর আড়ালেই নাভানার পরিবেশকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। অভিযুক্তরা টয়োটা সদর দপ্তরে নাভানা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও নেতিবাচক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ।

টয়োটা ও নাভানার দীর্ঘদিনের আস্থাভিত্তিক সম্পর্কের এই ভাঙন এবং একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে স্থানীয় অংশীদারের এমন আইনি সংঘাত দেশি-বিদেশি শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের গভীর নজরে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top