ঋণ নিল শিল্পগোষ্ঠী, খেলাপি হলো ব্যাংক!

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ)। কিন্তু সেই সবুজ তহবিলেও উন্মোচিত হচ্ছে, ভয়াবহ লুটপাট, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার চিত্র। চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ ওরফে এস আলমের কালো থাবা থেকে রেহাই পায়নি বিদেশি মুদ্রায় গঠিত এই তহবিলটিও।

দুই স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা, কঠোর যাচাই আর সরেজমিন পরিদর্শনের কথা থাকলেও বাস্তবে এই তহবিল পরিণত হয়েছে এস আলমের মতো কিছু প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও অসাধু কর্মকর্তাদের জন্য ‘রাজকোষে অবাধ প্রবেশাধিকার’-এ। অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে ঋণ বিতরণ এবং সেই ঋণ ফেরত না আসায় এখন ব্যাংকই খেলাপি হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে, যেসব ঋণের মধ্যে সবুজ তহবিল ছাড়াও এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ও লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটিও (এলটিএফএফ) রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালে ২১০ মিলিয়ন ডলারের জিটিএফ চালু করে। পরে এতে যুক্ত হয় আরও ২০০ মিলিয়ন ইউরো। নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানি ও উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আমদানির জন্য ব্যাংক ঋণ পাবে এবং সেই ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে শর্ত ছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকল্প যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিদর্শন রূপ নেয় ভ্রমণ বিলাসে। হেলিকপ্টার সফর, দামি হোটেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রকল্প পরিদর্শন’ লেখা ছবি, সবই হয়েছে। অথচ যেসব প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর অস্তিত্ব আজ কেবল কাগজে।

এস আলম গ্রুপের ছায়ায় জিটিএফ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের একাধিক প্রতিষ্ঠান জিটিএফ থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) থেকে মাত্র ১.৩১ শতাংশ সুদে ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলস নেয় ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি।

একই গ্রুপের ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলস-২ নেয় আরও ২ লাখ ৭৫ হাজার ডলার ও ৩৩ লাখ ইউরো।

২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলমের মেয়ের হাজবেন্ড বেলাল আহমেদের প্রতিষ্ঠান ইউনিটেক্স কম্পোজিট লিমিটেড নেয় ১ কোটি ২৬ লাখ ইউরো।

এই ঋণগুলোর প্রায় সবই এখন খেলাপি। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক দিচ্ছে গ্রাহকদের দেনা

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ঋণের অনুমোদন এসেছে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সরাসরি প্রভাবে। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও পরোক্ষ প্রভাব রেখেছেন।

এখন এস আলম ও তার পুরো পরিবার লাপাত্তা। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আর দায় গিয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলোর ঘাড়ে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংককে পুনঃঅর্থায়নের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। অথচ ডলার সংকটে ব্যাংকগুলোর তহবিল শূন্য। ফলে, নিজেরাই খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে ব্যাংক।

জামানতও ছিল ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’

আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের মূল্য অনেক ক্ষেত্রে মূল ঋণের অর্ধেকেরও কম। অথচ এই তহবিল ব্যবহারের নিয়ম ছিল, প্রকল্প ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ঋণ দেওয়া যাবে, বাকি অর্থ বিনিয়োগ করবে উদ্যোক্তা। বাস্তবে সেই শর্ত মানা হয়নি। ফলে সম্পদ বিক্রি করেও পুরো টাকা উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে মত ব্যাংকারদের।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যাচাই ও তদারকির দায়িত্বে থেকেও রিপোর্টে ‘সব ঠিক আছে’ বলে সুপারিশ করেছেন।

ইনফিনিয়া স্পিনিং: নাম আছে, উৎপাদন নেই

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সদস্য তালিকায় ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলসের উৎপাদনের কোনো বিবরণ নেই। শুধু নাম, ঠিকানা আর তিনটি ফোন নম্বর- যেগুলোর সবই বন্ধ। ফেসবুকে দেওয়া একটি নম্বরের মালিক নিজেকে গ্রুপের ব্র্যান্ডিং কর্মকর্তা দাবি করে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

৮৯১ কোটি টাকার ঋণ, প্রায় পুরোটাই খেলাপি

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে দেখা গেছে, শুধু এসআইবিএলেই ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলসের ঋণ ৮৯১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৯০ কোটি ৯ লাখ টাকা ইতোমধ্যে খেলাপি। বাকি অংশও এসএমএ পর্যায়ে—এক মাস পরই সেটিও মন্দ ঋণে পরিণত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসআইবিএলের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রকল্পগুলো একসময় চলমান ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর মালিকরা পলাতক হন, এলসি বন্ধ হয়ে যায়, ফলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়ে। কোম্পানি বিক্রির চেষ্টা চলছে, তবে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

তালিকায় আরো নাম

শুধু এস আলম নয়, জিটিএফ থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা আরও দীর্ঘ।

এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক ইউনিটেক্স সিলিন্ডার লি. ৩৬ লাখ ৯৩ হাজার ডলার ও ইউনিটেক্স স্পিনিং ৫৬ লাখ ৯২ হাজার ডলার ও প্রায় ৬০ লাখ ইউরো জিটিএফ থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেনি।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গ্রাহক এমএনআর গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান এক কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছে না। ফলে, ঋণগুলো খেলাপি হয়ে পড়ছে। স্বল্প সুদের সরকারি ফান্ডের এই অপব্যবহার সরাসরি জালিয়াতি ও লুটপাটের শামিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইডিএফ ও এলটিএফএফেও একই গল্প

শুধু জিটিএফ নয়, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ও লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটিতেও (এলটিএফএফ) অনিয়মের পাহাড়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, আওয়ামী আমলে এসব ফান্ডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ৮-৯ বছর ধরে একই জায়গায় বসে থেকে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছেন। এমনকী সম্প্রতি ইডিএফ পরিদর্শনে হেলিকপ্টার সফরের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, জিটিএফ ফান্ডের কিছু ঋণ খেলাপির দিকে যাচ্ছে, এমন তথ্য আমরা পাচ্ছি। যাচাই ও পরিদর্শন করা সত্ত্বেও যদি কারো গাফিলতি থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

১ thought on “ঋণ নিল শিল্পগোষ্ঠী, খেলাপি হলো ব্যাংক!”

Leave a Reply to 5betgame Cancel Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top