বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের ‘সেফ জোন’ চার দেশ

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতি ১০০ টাকার ১৬ টাকাই বিদেশে থেকে যায়, অর্থাৎ পাচার হয়ে যায়। আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কম-বেশি দেখিয়ে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যের আড়ালে এমন অবিশ্বাস্য পরিমাণের অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে।

পাচার হওয়া এই বিশাল অর্থের প্রধান গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং কানাডা। বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে মোট অর্থ পাচারের প্রায় ৮০ শতাংশই যায় এই চার দেশে।

জিএফআই-এর গত ২৬ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কেবল দুবাইয়েই পাচার হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার। এর পরেই রয়েছে সিঙ্গাপুর, যেখানে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এছাড়া মালয়েশিয়ায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার এবং কানাডায় প্রায় ৯০০ কোটি ডলার পাচার হওয়ার তথ্য মিলেছে।

আমদানিতে পণ্যের দাম বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে দাম কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)—এই দ্বিমুখী কৌশলে দেশের এই বিপুল সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ভুয়া এলসির মাধ্যমে দুবাই ও কানাডায় সবচেয়ে বেশি অর্থ সরিয়েছে পাচারকারীরা।

জিএফআই বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত পাচারের পরিমাণে শীর্ষে থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থানও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গত ১০ বছরে গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, উপযুক্ত তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো এই অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

জিএফআই-এর প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থ পাচারের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক দশকে চীন থেকে বাণিজ্যের আড়ালে পাচার হয়েছে ৬ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলার। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে ১ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন এবং ভারত থেকে ১ দশমিক শূন্য ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের তুলনায় পাচারের এই হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বার্ষিক হিসাবে চীনের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ভারতের প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থ এভাবে পাচার হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাচারের এই হার গড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রায় ১৬ টাকাই অবৈধভাবে বিদেশে থেকে যাচ্ছে অথবা পাচার হচ্ছে।

জিএফআই-এর মতে, এশিয়ার দেশগুলো থেকে বাণিজ্যের নামে এই টাকা পাচার হওয়া মানে শুধু আর্থিক লোকসান নয়; এটি দেশের সুশাসন নষ্ট করে এবং নিজের সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যদি এই ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার পাচার না হতো, তবে বাংলাদেশের বর্তমান ডলার সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তাই থাকত না। এই বিপুল অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের ১০টিরও বেশি বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং কানাডা ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য আইসিআইজেসহ অন্যান্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাজ্য, যেখানে গত এক দশকে আবাসন খাতে কয়েকশ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বিশেষ করে লন্ডনের বিলাসবহুল এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের বেনামে বাড়ি কেনার প্রবণতা এই পাচারের অন্যতম বড় প্রমাণ। এছাড়া ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশি নাগরিকদের জমানো অর্থের পরিমাণও বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।

প্যানোরামা পেপারস, প্যান্ডোরা পেপারসসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য নিরাপদ স্থান বা ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং পানামাতেও বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতে আবাসন খাত এবং হুন্ডির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হয়েছে। পর্যটন ও দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের প্রলোভনে থাইল্যান্ডের ‘এলিট ভিসা’ এবং সেকেন্ড হোম প্রকল্পের আড়ালেও বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সরানোর তথ্য মিলেছে।

জিএফআই-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দেশগুলোতে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে ‘ইনভয়েসিং কারসাজি’ এবং ‘হুন্ডি’ সমন্বয় করে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে আমদানিকৃত পণ্যের এলসি মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়ে দুবাই ও লন্ডনে অর্থ সরানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেছে।

সংস্থাটি সুপারিশ করেছে যে, বাণিজ্যের আড়ালে এই ‘নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ’ বন্ধে অবিলম্বে শুল্ক বিভাগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top