বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই জ্বালানি ধাক্কার ফলে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় করে তুলবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি ১ শতাংশ কমে যাবে, যা মূলত জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসেরই এক স্পষ্ট ইঙ্গিত। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পাঠানো গবেষণার ফলাফলে সানেম জানিয়েছে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ফলে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ এলএনজি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ আমাদের আমদানিকৃত এলএনজির ৭২ শতাংশই আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যা এই সমুদ্রপথ সচল থাকার ওপর নির্ভরশীল।
সানেম তাদের গবেষণায় ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’ মডেল ব্যবহার করে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য অভিঘাত বিশ্লেষণ করেছে। এই মডেল অনুযায়ী, জ্বালানি মূল্যের এই উল্লম্ফন কেবল জিডিপি কমাবে না, বরং রপ্তানি ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমিয়ে দেবে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন ১.৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে পরিবহন খাতে, যেখানে ৩ শতাংশ পতনের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কৃষি উৎপাদন ১ শতাংশ এবং জ্বালানি-নিবিড় অন্যান্য শিল্প খাতে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমে যেতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে সানেম উল্লেখ করেছে যে, সরকারি বার্তার সাথে মাঠপর্যায়ের জ্বালানি প্রাপ্যতার সুস্পষ্ট অমিল রয়েছে। একদিকে এলএনজি সংকটে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সানেম দ্রুত আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। জমি স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে রুফটপ সোলার বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর জোর দিতে হবে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে এই খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ব্যাঘাত মোকাবিলায় অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির জন্য একটি ‘কৌশলগত জাতীয় মজুত’ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অংশ হিসেবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম অবিলম্বে ত্বরান্বিত করতে হবে। সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সানেম কিউআর-কোড ভিত্তিক ডিজিটাল ফুয়েল পাসের মাধ্যমে জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্পখাতের উৎপাদন সময় অফ-পিক আওয়ারে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে সংরক্ষিত সীমিত জ্বালানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং অর্থনৈতিক বড় বিপর্যয় ঠেকানো যাবে।













