দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ শিল্পখাতে নজিরবিহীন ধসের জেরে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৩.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ দাপ্তরিক হিসাবে অর্থনীতির এই রুগ্ণ চিত্র উঠে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের (সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি) তুলনায় অনেক কম। মূলত নির্বাচনের আগে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং থমকে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগের ‘চড়া মাশুল’ দিচ্ছে দেশের অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধির এই রুগ্ন চিত্র ছিলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যে শিল্পখাতকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল ইঞ্জিন বলা হয়, সেই খাতের প্রবৃদ্ধি দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র ১.২৭ শতাংশে ঠেকেছে। কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় এবং ব্যবসায়ীদের চরম আস্থার সংকটে শিল্পের এই স্থবিরতা সামগ্রিক জিডিপিকে টেনে নিচে নামিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় ‘রেড অ্যালার্ট’ বা সতর্কবার্তা এবং বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জিডিপির এই মন্থরগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে উৎপাদনশীল শিল্প ও নির্মাণ খাতের শ্লথগতি। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে যে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকারখানার চাকা এবং পণ্য পরিবহনের ওপর। বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো প্রকল্প বা শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণ করায় বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেয়। শিল্পখাতের এই ১.২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন রেকর্ড।
শিল্পখাতের এই দুর্বলতা শুধু তাৎক্ষণিক প্রবৃদ্ধিকেই কমায়নি, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান, ব্যাংকঋণ এবং ভোক্তা চাহিদার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা শুধু সড়ক বা বন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যাহত করেনি, বরং তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নড়বড়ে করে দিয়েছে।
শিল্প ও বিনিয়োগের এই বিপর্যয়ের মধ্যেও ৪.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সেবা খাত অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রম সচল থাকায় এই খাতে কিছুটা গতি লক্ষ করা গেছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিবিএস কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু সেবা খাতের ওপর ভর করে একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; বরং শিল্প খাতের এই দুর্বলতা জাতীয় আয়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের কৃষি খাতে এ সময় ৩.৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। তবে কৃষি সচল থাকলেও শিল্পায়নের ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতা এই খাতের নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং ঋণের চড়া সুদের কারণে এমনিতেই দেশের ব্যবসায়ীরা কোণঠাস্য হয়ে আছেন। তার ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারেনি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। বিশেষ করে যেসব খাত আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রবৃদ্ধি যদি এভাবে কয়েক প্রান্তিক ধরে কমতে থাকে, তবে তা সরকারি রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি ও পরিবহন সংকটের মধ্যে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিল্প ও বিনিয়োগের গতি ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং জ্বালানি ও আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করা না গেলে অর্থবছরের পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতেও প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে থাকতে পারে। ৩.০৩ শতাংশের এই প্রবৃদ্ধি তাই কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর দশা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।













