ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড় বা ‘ওয়েভার’ পাওয়ার বিষয়টি এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাম্প্রতিক ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মারপ্যাঁচে সস্তায় জ্বালানি আমদানির বিকল্পগুলো আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
নিষেধাজ্ঞার দেয়াল ও ‘ওয়েভার’ পাওয়ার প্রতীক্ষা
রাশিয়া থেকে তেল ও এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ থাকলেও মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। এর আগে গত ১২ মার্চ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, রাশিয়া বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহে আগ্রহী হলেও সরকার এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘ওয়েভার’ বা বিশেষ ছাড় পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠকের পর মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান যে, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার সমাধান মূলত ওয়াশিংটনের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই ‘ওয়েভার’ চেয়েছে। সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ভারত এক মাসের জন্য রাশিয়ার তেল আমদানিতে বিশেষ ছাড় পেলেও বাংলাদেশের আবেদনটি এখনো বিবেচনাধীন।
বাণিজ্য চুক্তির নতুন সমীকরণ ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ
সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর বিশ্লেষণে এক নতুন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত সাম্প্রতিক ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে রাশিয়ার মতো দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও সংকুচিত হতে পারে।
এই চুক্তির ফলে যেকোনো বিকল্প উৎস থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বিশেষ সম্মতি নেওয়া এখন এক প্রকার ‘কৌশলগত বাধ্যবাধকতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে ছয় লাখ টন তেল আমদানির অপেক্ষায় থাকলেও এই ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পুরনো নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির নতুন শর্ত—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে। ড. দেবপ্রিয়র ভাষায়, নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এখন দেখার বিষয়, সরকার ভূ-রাজনৈতিক এই মারপ্যাঁচে ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
‘পরাবাস্তব’ লক্ষ্য ছেড়ে ‘নির্দয়’ বাজেটের পরামর্শ
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন নির্বাচিত সরকারকে একটি ‘কঠোর ও নির্দয়’ আর্থিক বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আদায়ের কাল্পনিক বা ‘পরাবাস্তব’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে সরকারকে বাস্তবমুখী হতে হবে। তাঁর মতে, জ্বালানি খরচ বাড়লে বছরে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির ১.১ শতাংশ। এর ফলে টাকার আরও অবমূল্যায়ন ঘটবে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে।
তিনি সরকারকে ৩-৪ মাসের একটি স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য একটি মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো তৈরির পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে সরকারকে কেবল বড় বাজেটের স্বপ্ন না দেখে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটতে হবে।













