বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) যশোরে দুস্থদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি সরকারের এই অবস্থান পরিষ্কার করেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, বিশ্বের অন্তত ৮০টি দেশে জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোনো মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করেনি।
বর্তমানে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চাহিদার সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত নিশ্চিত আছে এবং আগামী ৯০ দিনের নিরাপত্তা মজুত গড়ে তুলতে কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের আগে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তিন লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ থেকে এই জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের অনুমতি পাওয়া পাঁচটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকাকে সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের জোর তৎপরতাও শুরু করেছে সরকার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনটি জাহাজে করে প্রায় দুই লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস দেশে পৌঁছাবে।
এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা একটি জাহাজ ইতিমধ্যে কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে এবং বাকি দুটি আগামী বুধবারের মধ্যে বন্দরে ভিড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিকল্প আমদানির ফলে কাতার-নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, এই সুযোগে যারা জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। এক দিনেই দেশের ৬২টি জেলায় ২৯৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এই অভিযানে অবৈধ মজুত ও অনিয়মের দায়ে ৭৮টি মামলা এবং তিন লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।
এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা এলাকায় এক অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা ৩০ ড্রাম (প্রায় ছয় হাজার লিটার) ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে ডিজেল লোডিং-আনলোডিংয়ের কাজে ব্যবহৃত তিনটি পাম্পও উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত ডিজেলের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা।
একই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় ‘মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশন’-কে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে তেল মজুত রাখায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ নোটিশ টাঙিয়ে রাখলেও ভেতরে নয় হাজার ৭৮৩ লিটার তেল উদ্ধার করে প্রশাসন।
জ্বালানি তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এখন থেকে অবৈধ মজুতের সঠিক তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া তদারকি জোরদার করতে জেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ‘ভিজিল্যান্স টিম’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই টিমগুলো তেলের ডিপো থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।













