মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইন যখন হুমকির মুখে, ঠিক তখন অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বুধবার (২৫ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে জ্বালানি মজুদ দ্বিগুণ করা এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কা সামাল দিতে সরকার দেশের জ্বালানি তেলের রিজার্ভ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের আগে যেখানে ১৫ দিনের রিজার্ভ নিশ্চিত করা হতো, বর্তমানে তা এক মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী এই মজুদ আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যাতে বৈশ্বিক বাজারে যেকোনো আকস্মিক মূল্যের অস্থিরতা বা সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।”
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী ও জ্বালানি মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জ্বালানি সরবরাহ চেইন সচল রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। বিশেষ এই বৈঠকটি মূলত বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা থাকলেও ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির কারণে একদিন এগিয়ে আনা হয়। বৈঠকের শুরুতে ২৫শে মার্চের কালরাত্রির শহীদদের স্মরণে বিশেষ দোয়া ও শোক প্রকাশ করা হয়।
একই দিনে পৃথক এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য ও গুজব থেকে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের ফলে বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হয়, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।” তিনি আরও জানান, সরকার বর্তমানে উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এই লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই সংকটের গভীরতা ফুটে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) উপ-মহাপরিচালক জ্যাঁ-মারি পগামের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায়। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন এবং সার সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এই সতর্কবার্তার প্রতিধ্বনি করে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরবরাহ চেইন সচল রাখতে সরকার একটি সুপরিকল্পিত ‘রেশনিং’ ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে, যা কোনো অব্যবস্থাপনা নয় বরং একটি দূরদর্শী সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
এদিনের মন্ত্রিসভা বৈঠকে জ্বালানির পাশাপাশি অর্থনীতি সংক্রান্ত আইনি সংস্কারেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। মন্ত্রিসভা ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক সংশোধন আইন ২০২৬’ এবং ‘অর্থসংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন আইন’সহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এসব আইন আসন্ন সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের এই আগাম প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগ ও শুল্ক আইনের সংস্কার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে।













