মধ্যপ্রাচ্যের বারুদ যখন ভাতের থালায়

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

উৎসবের আলো বনাম যুদ্ধের অন্ধকার—এই অসম লড়াইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবী আজ এক ঐতিহাসিক খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। একদিকে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের দামামা; যার সরাসরি শিকার হতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিল।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রধান এনগোজি ওকোনজো-আইওয়ালা স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের শিখা এখন সরাসরি সারের আন্তর্জাতিক বাজারে আঘাত হেনেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বারুদ আর রক্তের এই খেলা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে এমনভাবে বিষিয়ে দিচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে এক দেশহীন, সীমানাহীন দুর্ভিক্ষের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে।

জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনগোজি ওকোনজো-আইওয়ালা সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য বৈশ্বিক সারের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। বিশ্বের মোট নাইট্রোজেন সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এই জলপথের অস্থিরতা সারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা কৃষকদের সার ব্যবহার কমাতে বা কম উৎপাদনশীল ফসল চাষে বাধ্য করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট এড়াতে এবং ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছাতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও কৃষি বাণিজ্যের পথগুলো উন্মুক্ত ও স্থিতিশীল রাখা জরুরি বলে তিনি জোর দিয়েছেন। ডব্লিউটিওর তথ্যানুসারে, লোহিত সাগর ও এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় পরিবহন ভাড়া ও বীমা খরচ অবিশ্বাস্যভাবে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সারের মূল উপাদান প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক কৃষি বাজার এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

কৃষিতে এই সারের অভাব বা উচ্চমূল্যের প্রভাব হবে সরাসরি এবং বিধ্বংসী। নাইট্রোজেন ও পটাশ সারের সরবরাহ কমে গেলে মাটির উর্বরতা তাৎক্ষণিকভাবে হ্রাস পায়। কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, সারের পর্যাপ্ত ব্যবহার না হলে হেক্টর প্রতি ফসলের ফলন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কৃষকরা খরচ বাঁচাতে সারের ব্যবহার কমিয়ে দিলে উৎপাদিত ফসলের গুণগত মানও নষ্ট হবে, যা প্রকারান্তরে পুষ্টিহীনতা ও খাদ্যমূল্য আকাশচুম্বী করার মাধ্যমে একটি ‘সাইলেন্ট ফ্যামিন’ বা নীরব দুর্ভিক্ষের জন্ম দেবে।

ডব্লিউটিও এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৪.৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। সারের এই সংকটে শস্য উৎপাদন ব্যাহত হলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও ৫ কোটি মানুষ এই তালিকায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন বলছে, খাদ্যের দাম মাত্র ১ শতাংশ বাড়লে বিশ্বে অতিরিক্ত ১ কোটি মানুষ অতি দারিদ্র্যের শিকার হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে সারের অভাবে আরও ৮ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে তলিয়ে যেতে পারে।

সারের সংকটের সমান্তরালে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার এখন আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল ইরানের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের চার দেশে সাতটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হামলার জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্যমতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের এলএনজি আমদানির যথাক্রমে ৯৯ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ পায় কাতার থেকে, অন্যদিকে ভারত তাদের চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি এলএনজি সংগ্রহ করে এই একই উৎস থেকে। যেহেতু কাতারের প্রায় সব প্রাকৃতিক গ্যাস রাস লাফানে প্রক্রিয়াজাত ও সেখান থেকে রপ্তানি করা হয়, তাই এই শিল্পনগরীতে হামলা মানেই এই তিন দেশের এলএনজি সরবরাহ চেইনে সরাসরি আঘাত।

এই আকস্মিক সরবরাহ বিপর্যয়ের ফলে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের সচলতা অনেকাংশেই এলএনজির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই ঘাটতি অর্থনীতিতে এক নেতিবাচক চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর মতে, বিকল্প উৎসের অনুপস্থিতিতে এই জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ খাতের অন্ধকার নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক শিল্পায়নের গতিকেও খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে।

এই ‘এনার্জি শক’ সরাসরি কৃষির সেচ ব্যবস্থা এবং শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক সংকটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম গত দুই মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা সীমিত করতে হওয়ায় দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও লোহিত সাগরের অস্থিরতায় সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল। জ্বালানি ও গ্যাসের এই উচ্চমূল্য কেবল কৃষি নয়, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকেও খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের জানুয়ারি ২০২৬-এর আউটলুক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, সারের উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার কৃষকরা ব্যবহার অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ভূ-রাজনৈতিক বারুদ দ্বিমুখী আঘাত নিয়ে আসছে, কারণ বাংলাদেশ মূলত কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সার আমদানি করে। এই অঞ্চলে এখন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস ও সিপিডির তথ্যমতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০.৫ শতাংশের ওপরে থাকায় দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার গত জানুয়ারি থেকে রাশিয়া, মরক্কো ও কানাডার সঙ্গে ‘জি-টু-জি’ ভিত্তিতে সার আমদানির নতুন চুক্তি সই করে বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সারের ভর্তুকি আগের বছরের তুলনায় আরও ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ ও কৃষি কার্ড বিতরণের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের ১ কোটি পরিবারের জন্য টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে বিলাসবহুল সরকারি স্থাপনায় ব্যবহার সীমিত করাসহ সৌরচালিত সেচ পাম্পে বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে প্রশাসন।

যদি বিশ্বনেতারা আন্তর্জাতিক সরবরাহ পথগুলো দ্রুত নিরাপদ করতে ব্যর্থ হন, তবে ২০২৬ সাল আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের বছর হিসেবে চিহ্নিত হবে। সারের সংকট মানে কেবল মাটির অনুর্বরতা নয়, এটি কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার যা রাজনৈতিক মানচিত্রকে ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) জেনেভা প্রেস কনফারেন্স (১৯ মার্চ ২০২৬), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গ্লোবাল রিপোর্ট (ফেব্রুয়ারি ২০২৬), বিশ্বব্যাংক পোভার্টি ডাটা (ডিসেম্বর ২০২৫), পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাসিক বুলেটিন (২০২৬)।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top