এলডিসি উত্তরণ পেছাতে চায় বিএনপি, কেন?

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় গত ২৫ নভেম্বর উত্তরণ-সংক্রান্ত সময়সূচি পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন তুলেছিলেন।

যার ধারাবাহিকতায় তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত ওই চিঠি বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বরাবর পাঠানো হয়েছে।

জাতিসংঘের সিডিপির কাছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সময়সীমা ২০২৬ থেকে বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার আবেদন জানানো হয়। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ইআরডি সচিব গণমাধ্যমকে জানান, আবেদনটি জাতিসংঘের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ২৪–২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সিডিপির বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার জাতিসংঘকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করে যে, ২০২৬ সালে গ্র্যাজুয়েশনের আগে পাওয়া প্রস্তুতিমূলক সময় কোভিড-১৯–পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক মুদ্রানীতির কড়াকড়ি এবং বিশ্বব্যাপী মন্দার প্রভাব অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগ হ্রাস, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার কারণে কাঠামোগত সংস্কার প্রত্যাশিত গতিতে সম্পন্ন হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সরকার একটি ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ সম্পন্ন করে ‘স্মুথ ট্রানজিশন’ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

সচিবালয়ে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীরও বলেছিলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ডেফার করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবির বিষয়টিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ ‘স্পেশাল অ্যান্ড ডিফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট’ এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারাবে। বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার বিলুপ্ত হলে রপ্তানি পণ্যে ৮–১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি থাকতে পারে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সরকারি বিশ্লেষণে বার্ষিক রপ্তানি আয় ৫–৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী রপ্তানি খাতে নগদ ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে এবং ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত ছাড় প্রত্যাহার হতে পারে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ব্যয় বৃদ্ধি ও গ্রেস পিরিয়ড হ্রাসের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে সরকারের মত।

তবে ঢাকার বনানীর হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আমরা পাপেট (তথা ক্রীড়নক) ব্যবসায়ী সংগঠন চাই না।”

এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “আজ হোক, কাল হোক বা দুই বছর পরে—বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবেই।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি সোমালিয়া বা দক্ষিণ সুদানের কাতারে থাকতে চাই, নাকি মর্যাদা নিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাব?”

যদিও একই গোলটেবিলে হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ. কে. আজাদ বলেন, এলডিসি উত্তরণ হলে রপ্তানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে এবং পদ্ধতিগত চাপ তৈরি হতে পারে, যা ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা কঠিন।

তিনি উল্লেখ করেন, কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে ইতোমধ্যে ১২ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ লোক চাকরি হারাতে পারেন বলে তাঁর আশঙ্কা।

এর আগে ২৫ নভেম্বর তারেক রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইংরেজিতে লেখা পোস্টে এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে মতামত দেন। তিনি লেখেন, “একটি দেশ যেই সরকারকে নির্বাচিত করেনি, সেই সরকার দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না।”

তিনি আরও লেখেন, “বিএনপি আগেও বলেছে, সময় নেওয়ার বিকল্পের পথে না গিয়ে ২০২৬ সালে উত্তরণের সময়সূচি এগিয়ে নেওয়া পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অথচ তা নিচ্ছে এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট নেই। তারপরও তারা এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে বহু দশক ধরে প্রভাবিত করবে।”

জাতিসংঘের বিধান প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “অ্যাঙ্গোলা ও সামোয়ার মতো দেশগুলোর জন্য উত্তরণের সময়সীমা পরিবর্তন করা হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মও বলছে—কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে ধাক্কা খেলে সময়সীমা নিয়ে নমনীয়তা দেখানো যায়। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে বাড়তি সময় চাওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।”

তিনি আরও লেখেন, “সরকারি নথিপত্রে বলা হয়েছে, দেশের ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে ব্যাংকিং খাতে চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা, ঋণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, রপ্তানি শ্লথ হয়ে আসার চাপ মোকাবিলা করছেন। এটা উত্তরণবিরোধী কোনো যুক্তি নয়। বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু উত্তরণে ‘যোগ্য’ হওয়া আর ‘প্রস্তুত’ হওয়া এক জিনিস নয়।”

অবশেষে নবনির্বাচিত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং বিষয়টি জাতিসংঘের প্রক্রিয়াধীন বিবেচনায় রয়েছে। সিডিপির পর্যালোচনা ও পরবর্তী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এলডিসি উত্তরণ-সংক্রান্ত সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে, নাকি বাংলাদেশ অতিরিক্ত সময় পাবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top