৪২টি মেগা প্রকল্প: ৪০% বরাদ্দ গায়েব, ব্যয় বৃদ্ধি ৪০০% পর্যন্ত

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

উন্নয়নের আড়ালে ঋণের পাহাড় ও সুশাসনের চরম সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে। গত দেড় দশকে দেশের বৈদেশিক ঋণ ৩৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও এর একটি বিশাল অংশই দুর্নীতির ‘মাস্টারমাইন্ডদের’ পকেটে গেছে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত ‘পাবলিক ডেট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পগুলোতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ দুর্নীতির কারণে অপচয় হচ্ছে, যা দেশকে দ্রুত এক ভয়াবহ ঋণ-ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গবেষণার তথ্যমতে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা ৩৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। এই ঋণের ভার কেবল সংখ্যায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা হিসেবে চেপে বসছে। বর্তমানে প্রতি ৫ টাকা রাজস্বের ১ টাকা কেবল ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৬৫-৭০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বর্তমানে সংশোধিত হিসাবে ৪২ শতাংশ।

পরিবহন, বিদ্যুৎ, বিমান চলাচল ও বন্দরসহ ৪২টি মেগা প্রকল্প বিশ্লেষণে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকল্পগুলোর মূল পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে নজিরবিহীন হারে। এর মধ্যে ২৯টি মেগা প্রকল্পে গড় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০.৩ শতাংশ। প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ রাজনৈতিক যোগসাজশ, অদক্ষতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়েছে। সরাসরি সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তিবদ্ধ প্রকল্পগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের তুলনায় খরচ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দেখানো হয়েছে।

সরকারি ঋণ ও সুশাসন সংক্রান্ত আলোচনায় বিদ্যুৎ খাতকে দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘টেক-অর-পে’ (বিদ্যুৎ না নিলেও দাম দেওয়ার বাধ্যবাধকতা) চুক্তির কারণে ২০২৫ সালে ফিক্সড ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারকে গুনতে হবে ৩৮,০০০ কোটি টাকা। গবেষণায় বিদ্যুৎ খাতের অসংগতি তুলে ধরে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪ গুণ বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে; বসিয়ে রেখে কেন্দ্রগুলোকে দেওয়া ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা স্থির খরচের পরিমাণ বেড়েছে ২০ গুণ।

বিশেষ করে ভারতের আদানি গোড্ডা প্রকল্পের উদাহরণ টেনে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, এই প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশকে ভারতের স্থানীয় গ্রিডের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এর ফলে আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খানের মতে, জ্বালানি মহাপরিকল্পনাটি দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত সক্ষমতা (৯,৫০০ মেগাওয়াট) থাকার পরেও বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই ভর্তুকি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত দেউলিয়াত্বের দিকে এগোবে।

অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান তাঁর উপস্থাপনায় শ্রীলঙ্কার সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, “বাংলাদেশে কেবল নিয়ন্ত্রণের অভাব নেই, বরং রয়েছে নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিতদের মধ্যে ‘অনুভূমিক যোগসাজশ’। অর্থাৎ, যারা দুর্নীতি ঠেকানোর কথা, তারাই দুর্নীতির প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এই যোগসাজশ ভাঙতে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।”

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারে বলেন, “ঋণ গ্রহণ যেন প্রকৃত টেকসই উন্নয়নে রূপান্তরিত হয়, তার জন্য অর্থায়ন ও নীতিকে একীভূত করতে হবে।” বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, “বিশেষ আইন বাতিল করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র চালু করায় সৌরবিদ্যুতের শুল্ক ১০ সেন্ট থেকে ৫-৮ সেন্টে নামানো সম্ভব হয়েছে।”

বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে গবেষণায় ‘সুপরিকল্পিত সুশাসন কাঠামোর’ ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রস্তাবনায় বলা হয়—আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন অডিট বা নিরীক্ষার মাধ্যমে দেশের গোপন ও দ্বিপাক্ষিক ঋণের প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। যেসব প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেই ব্যয়বহুল চুক্তিগুলো অবিলম্বে পুনর্নির্ধারণ অথবা প্রয়োজনে বাতিল করতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতের আলোচিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রথা বাতিল করে প্রকৃত সরবরাহের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধের নিয়ম চালু করতে হবে। এ ছাড়া জ্বালানি খাত সংস্কারে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘জ্বালানি তদারকি কমিশন’ গঠন করার সুপারিশ করা হয়।

গবেষণাটি সতর্ক করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ এখন ‘পরিমিত ঋণ’ অবস্থান থেকে ‘পরিশোধ সক্ষমতার ঝুঁকি-ফাঁদের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করার আগেই যদি এই দুর্নীতির দুষ্টচক্র এবং গোপনীয় দায়বদ্ধতা কমানো না যায়, তবে দেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়বে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top