দীর্ঘদিনের জগদ্দল পাথর হয়ে থাকা ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ ভেঙে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনাই হবে নবগঠিত বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই দিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মাফিয়া সিন্ডিকেট নির্মূলের কঠোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। বিগত সময়কালে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থির রাখার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা উপড়ে ফেলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা রুখতে প্রশাসনকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, “আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকবেন। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সকল ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।”
“ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা ছোট-বড় সকল ব্যবসায়ীর প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ এবং স্পষ্ট। বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থরক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সুতরাং, সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থরক্ষা হবে, এ ব্যাপারে আপনাদের যেকোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। ক্রেতা, বিক্রেতা ও গ্রহীতা—এই সরকার সকলেরই সরকার,” যোগ করেন তারেক রহমান।
এর আগে দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ সভায় প্রথাগত ১০০ দিনের পরিবর্তে ১৮০ দিনের একটি বৃহত্তর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য। সভার পর তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখা এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ইফতার ও তারাবিতে যেন কোনো কষ্ট না হয়।” তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা বাস্তবায়নে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আপনারা জানেন, প্রত্যেকটা সরকার প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি নেয়। আমাদের সরকার সেই কর্মসূচিটি একটু বৃহত্তর পরিসরে ১৮০ দিনের জন্য গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান যে প্রধানমন্ত্রী সচিবদের উদ্দেশে বলেছেন, “আমাদের ইশতেহারের ওপর জনগণ আস্থা রেখেছে। তাই যথাযথ সময়ে যথাযথভাবে এই ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হবে।”
অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি সভায় দেওয়া নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে জনগণকে স্বস্তি দিতে যার যার জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, বিএনপি মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো মনে রেখে মন্ত্রণালয়গুলোকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তাঁদের নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা দু-এক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করবেন, যার ভিত্তিতে ১৮০ দিনের এই মহাপরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, “বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করবে। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদীয় দলের এইসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শেরই প্রতিফলন।”
“সরকার গঠন করার সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে—দলমত, ধর্ম, দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার,” যোগ করেন তিনি।
জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের ‘জনসম্পদ’। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং স্বচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদের কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে।”
রাজধানীর যানজট নিরসন ও জনসংখ্যা বিকেন্দ্রীকরণে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মানুষ তাঁর নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসাবাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল, নৌ, সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে।”
তাঁর ভাষ্য, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সারাদেশে জুয়া এবং মাদকের বিস্তারকেও বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। সুতরাং, জুয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবরকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।”













