বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ কর্তাব্যক্তি এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হওয়া বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির পর্দা উন্মোচন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি, আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রুপটির চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এক নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে কমিশনের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
আসামিদের তালিকায় রয়েছেন দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং খাতের একাধিক পরিচিত মুখ। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ছাড়াও তালিকায় নাম এসেছে বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিয়াত সোবহান এবং পরিচালক ময়নাল হোসাইন চৌধুরীর।
একইভাবে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির সাবেক পর্ষদ ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই জালিয়াতির সাথে সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ (সি. এম. আহমেদ) এবং পরিচালক মনোয়ারা শিকদার, পারভীন হক শিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক শিকদার ও রন হক শিকদারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, এই আসামিরা পরস্পরের সাথে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম এবং ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নামে ৫৭৫ কোটি টাকার ফান্ডেড এবং ৭৫০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না।
এই বিশাল অংকের অর্থ ছাড়ের পেছনে কোনো কার্যকর জামানত ছিল না এবং গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পর্যন্ত যাচাই করা হয়নি। এমনকি কোনো ধরনের কারখানা পরিদর্শন বা স্টক রিপোর্ট ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, বিতরণকৃত ৫৭৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৫০৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল ব্যবসায় ব্যবহার না করে বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ অনলাইন ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর, বিল ও ওডি ঋণ সমন্বয় এবং এমনকি ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে।
দুদকের দাবি অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থের অবৈধ উৎস ও মালিকানা গোপন করার হীন উদ্দেশ্যেই এসব জটিল লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে। সংস্থার সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান ভূঁইয়া বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেছেন। দুর্নীতির এই বিশাল জাল ছিঁড়তে দুদক, সিআইডি, কাস্টমস, ভ্যাট এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।
এই তদন্ত দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি বড় আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।













