ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ আক্ষরিক অর্থেই ‘কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের সংসদে’ পরিণত হয়েছে। সংসদ ভবনে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকের পর দলটি ঘোষণা করেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমাতে তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত (ডিউটি-ফ্রি) গাড়ি এবং সরকারি প্লট বা ফ্ল্যাট সুবিধা গ্রহণ করবেন না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিসংখ্যান বলছে, নবনির্বাচিত সংসদের ৭৯.৪৬ শতাংশ সদস্যই কোটিপতি। ২৩৬ জন সদস্যের সম্পদের পাহাড় যেমন রয়েছে, তেমনি ১৩ জন সদস্য নাম লিখিয়েছেন ‘শতকোটিপতি’র তালিকায়। পেশাগত দিক থেকে ব্যবসায়ীদের জয়জয়কার আগের মতোই অটুট; প্রায় ৬০ শতাংশ সংসদ সদস্যই সরাসরি ব্যবসা জগতের মানুষ। যদিও গত দ্বাদশ সংসদের তুলনায় ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে, কিন্তু নবম সংসদের তুলনায় তা ৩ শতাংশ বেশি। রাজনীতির ময়দানে শিক্ষকতা (৮.১ শতাংশ) এবং আইন পেশার (১১.৮ শতাংশ) মানুষের পদচারণা থাকলেও অর্থশক্তির দাপটে তারা অনেকটাই ম্লান।
আবার এই বিত্তশালীদের কাঁধেই রয়েছে ঋণের পাহাড়। ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের মোট ঋণের পরিমাণ ১১,৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চারটি সংসদের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শীর্ষ ১০ ঋণগ্রস্ত সংসদ সদস্যের প্রত্যেকেই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য নৈতিক অবস্থান নিয়েছে নবনির্বাচিত সরকারি দল।
আইন অনুযায়ী, এই জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিপুল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। প্রধানমন্ত্রী মাসিক ১,১৫,০০০ টাকা মূল বেতন এবং ১,০০,০০০ টাকা ব্যয়ভাতা পাবেন। এ ছাড়া তাঁর জন্য দেড় কোটি টাকার বার্ষিক স্বেচ্ছাধীন তহবিল এবং ২৫ লক্ষ টাকার বীমা সুবিধা বরাদ্দ রয়েছে।
একজন পূর্ণ মন্ত্রী মাসিক ১,০৫,০০০ টাকা বেতন এবং ১০ লক্ষ টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল পান। পাশাপাশি, সাধারণ সংসদ সদস্যরা মাসিক ৫৫,০০০ টাকা মূল বেতনের সঙ্গে নির্বাচনী এলাকা ভাতা, যাতায়াত ভাতা ও চিকিৎসা সুবিধা পান। অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের জন্য মোবাইল বিল, নির্বাচনী অফিস খরচসহ নানা আর্থিক বরাদ্দ থাকলেও বিএনপির সদস্যরা গাড়ি ও প্লট সুবিধা বর্জন করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছেন।
উজ্জ্বল সব পরিসংখ্যানের আড়ালে এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে। এবারের সংসদে মাত্র ২.৩৬ শতাংশ নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা ২০০৮ সালের তুলনায় অর্ধেক এবং বিগত ৪টি নির্বাচনের মধ্যে সর্বনিম্ন। মাত্র ৭ জন নারী সদস্যের সংসদে উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান অর্থশক্তি ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য সাধারণ ও নারী প্রার্থীদের পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে।
টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নির্বাচনে ‘বিজয়ীবোধের অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ ও নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের ফলে সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিক। ৬০ শতাংশ ভোট পড়লেও টিআইবি মনে করে, ভোটারদের একাংশের মধ্যে আস্থার অভাব ছিল, যা তাদের ভোটদান থেকে বিরত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর বিত্তশালী মন্ত্রিসভার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আস্থাহীনতা দূর করা এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা বর্জনের মতো নৈতিক অবস্থানগুলোকে সুশাসনের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ব্যবসায়ী ও কোটিপতিদের এই সংসদ সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।













