দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবেশ লেগেছে পুঁজিবাজারে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন এক উন্মাদনা। এই জোয়ারে ভালো কোম্পানির পাশাপাশি বন্ধ, উৎপাদনহীন ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরও বেড়েছে। আজ ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৯২ শতাংশ শেয়ারের দাম বেড়েছে।
আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক এক লাফে ২০০ পয়েন্ট বা ৩.৭১ শতাংশ বেড়েছে। লেনদেনও দীর্ঘ বিরতির পর ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকার ঘর। কিন্তু এই বিপুল উত্থানের নেপথ্যে বাজারের কোনো ‘ফান্ডামেন্টাল’ বা মৌলভিত্তির পরিবর্তন নেই—পুরোটাই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক আশাবাদকে কেন্দ্র করে।
বাজার বিশ্লেষকরা বর্তমানের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের সাথে তুলনা করছেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে ডিএসই সূচক ৩০৬ পয়েন্ট বা ৫.৪ শতাংশ বেড়েছিল। সে সময় টানা কয়েক দিনে সূচক প্রায় ১ হাজার পয়েন্ট বাড়লেও শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং শুধুমাত্র ঢালাও এনফোর্সমেন্টের কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা আবার সাইডলাইনে ফিরে যান এবং বাজার দীর্ঘমেয়াদে মন্দায় পতিত হয়। এবারের র্যালিতেও সেই একই ‘হুজুগ’ কাজ করছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।
আজকের বাজারের সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো ‘জাঙ্ক’ বা পচা শেয়ারের আকাশচুম্বী দরবৃদ্ধি। বিশেষ করে বিএনপি সমর্থিত হিসেবে পরিচিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এমনকি দেউলিয়া প্রায় ব্যাংক এবং অবসায়নের অপেক্ষায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারও আজ ‘সার্কিট ব্রেকার’ স্পর্শ করেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, আজ রবিবার পুঁজিবাজারে যে উল্লম্ফন দেখা দেবে, তা গত দুই দিনে ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপের বার্তা থেকেই টের পাওয়া গেছে। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপগুলো থেকে বিপুল প্রত্যাশার ‘হাইপ’ তোলা হয়েছে, যার প্রভাব দেখা গেছে আজকের বাজারচিত্রে। ডিএসইতে দরবৃদ্ধি পাওয়া শীর্ষ ১০ কোম্পানির ৮টিই জাঙ্ক। বিশেষ করে অভিহিত মূল্যের নিচে থাকা প্রায় সব শেয়ারের দামই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
মৌলভিত্তি সম্পন্ন ব্যাংকের পাশাপাশি দেউলিয়া পর্যায়ে থাকা এনবিএল, আইএফআইসি, এবি ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ারের দামও বেড়েছে। রবিবার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯০টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৬৪টির। বিপরীতে দর কমেছে ২৬টির। অপরিবর্তিত ছিল ৪টি সিকিউরিটিজ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কারণ ছাড়াই যখন খাদের কিনারে থাকা কোম্পানির দর বাড়ে, তখন বুঝতে হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা চলছে। এর ফলে আগামীতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মূলধন হারানোর বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “কেবল রাজনৈতিক আবেগে ভেসে শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। যেসব শেয়ারের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল, সেগুলোতে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ব্যবসায়িক আয় রাতারাতি বাড়িয়ে দেয় না। তাই কোনো শেয়ার কেনার আগে সেটির ডিভিডেন্ড হিস্ট্রি এবং আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করে নিন। সাইডলাইনে থাকা বড় বিনিয়োগকারীরা ফিরতে শুরু করলেও তারা মূলত ভালো শেয়ারের দিকেই নজর দিচ্ছেন।”
এদিকে পলিটিক্যাল র্যালির এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে বিভিন্ন শেয়ারে পজিশন নিচ্ছেন। ফলে ডিএসইতে অনেক দিন পর লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগকারীরা যখন অত্যন্ত আশাবাদী থাকেন এবং বাজার দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন একে ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলা হয়। এটি মূলত একটি সাময়িক আবেগপ্রসূত সময়, যখন বাজারের মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন না হয়ে কেবল মানুষের প্রত্যাশা বা ‘সেন্টিমেন্ট’ পরিবর্তনের কারণে দাম বাড়ে। যদি এই র্যালিতে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই দাম অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং পরবর্তীতে তা ধসে পড়ে, তবে একে ‘স্পেকুলেটিভ বাবল’ বলা হয়।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মতে, বর্তমানের এই রাজনৈতিক র্যালিকে দীর্ঘমেয়াদি করতে হলে কেবল আশাবাদ যথেষ্ট নয়। বাজারের এই জোয়ার ধরে রাখতে হলে সরকারকে খুব দ্রুত ভালো মৌলভিত্তির সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি কারসাজি রোধে বিএসইসিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় ২০২৪ সালের মতো এই হাজার পয়েন্টের উত্থান বুদবুদের মতো মিলিয়ে যেতে সময় লাগবে না।
বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নিরসনে নতুন সরকারকে সুশাসনের ওপর জোর দিতে হবে উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান বলেন, “পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা হলো গুড গভর্ন্যান্স বা সুশাসনের অভাব। বর্তমান সরকারকে প্রথমেই এই জায়গায় হাত দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। এর ফলে কোম্পানিগুলো তাদের আয়ের তথ্য কারসাজি করে এবং পরবর্তীতে শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজি হয়। এটি বন্ধ করতে হবে।”
মনিরুজ্জামান বলেন, “অনেক দিন ধরেই বাজারে ভালো শেয়ার নেই। দুর্বল কোম্পানিগুলো শুধু অর্থ আত্মসাতের জন্য বাজারে আসে। এই ধারা পরিবর্তন করে বাজারকে মূলধন সংগ্রহের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বর্তমান ট্যাক্সেশন সিস্টেম এবং আইপিও সংক্রান্ত আইনটি অকার্যকর। এই আইনের মাধ্যমে ভালো কোম্পানি বাজারে আনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। তাই নতুন সরকারকে এই আইনটি দ্রুত রিভিউ বা সংশোধন করতে হবে।”













