ভাবুন, আপনি কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশে সবুজ, আকাশ পরিষ্কার। আপনি বেশ গভীর শ্বাস নিলেন। বুক ভরে ঠান্ডা, তাজা বাতাস ঢুকে গেল। তখন মনে হতে পারে; এই বাতাসের দাম কীভাবে মাপা যায়? তাজা বাতাস তো অমূল্য।
কিন্তু বাস্তব পৃথিবী একটু আলাদা। শহর সর্বদা ব্যস্ত, সেখানে অনেক গাড়ি চলে। কারখানা থেকে ধোঁয়া বের হয়। রান্নার জন্য কেউ কেউ এখনো দূষণ তৈরি করে এমন জ্বালানি ব্যবহার করে। এসব কারণে বাতাস দূষিত হয়। তখন সেই বাতাস পরিষ্কার করতে টাকা খরচ করতে হয়।
কারখানাগুলোকে নতুন মেশিন কিনতে হয় যাতে কম ধোঁয়া বের হয়। কিছু কারখানাকে হয়তো ছোট হতে হয়, কখনো বন্ধও হয়ে যায়। পরিবারগুলোকে পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, যা অনেক সময় বেশি দামী। মানে, পরিষ্কার বাতাস পেতে হলে সবাইকে কিছু না কিছু খরচ করতে হয়।
কিন্তু অন্য দিকও আছে। দূষিত বাতাসে মানুষ অসুস্থ হয়। শিশুদের বেশি কষ্ট হয়। বয়স্ক মানুষ ও আগে থেকে অসুস্থ যারা, তাদের জন্য এটা আরও বিপজ্জনক। অনেক সময় মানুষ অকালেই মারা যায়। যদি বাতাস পরিষ্কার থাকে, তাহলে এসব অসুখ কম হবে। মানুষ সুস্থ থাকবে। চিকিৎসার খরচও কমবে। অনেক জীবন বাঁচবে।
এখন আসল প্রশ্ন হলো; আমরা কত টাকা খরচ করব বাতাস পরিষ্কার রাখতে? একদিকে আছে টাকা খরচের বিষয়। অন্যদিকে আছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য। অর্থনীতিতে এই দুই দিক তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কিন্তু যখন কথা আসে মানুষের জীবন বাঁচানোর, তখন হিসাব করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ তখন আমাদের ভাবতে হয়; একজন মানুষের জীবনের দাম কত? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তাই তাজা বাতাসের মূল্য শুধু টাকায় মাপা যায় না। এটা মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য আর ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সংস্থা আছে, যার কাজ পরিবেশ রক্ষা করা। এই সংস্থার নাম পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, বা ইপিএ। তারা আগে হিসাব করত; বাতাস পরিষ্কার করলে মানুষের কত উপকার হবে, আর সেই উপকারের আর্থিক মূল্য কত।
কিন্তু গত মাসে তারা বলেছে, এখন থেকে তারা আর এই উপকারের টাকার হিসাব করবে না। মানে, পরিষ্কার বাতাসে মানুষ কম অসুস্থ হবে বা কম মারা যাবে; এই লাভের কোনো নির্দিষ্ট টাকা তারা ধরবে না।

প্রতীকী ছবি
কর্মকর্তারা বলছেন, এই লাভের সঠিক মূল্য কত, তা ঠিক করে বলা কঠিন। তাই তারা এটি হিসাবের বাইরে রাখবে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এটা আসলে নিয়ম-কানুন ঢিলা করার একটা উপায়। কারণ একটা কথা আছে; যা হিসাবের মধ্যে আসে না, সেটাকে গুরুত্বও কম দেওয়া হয়। যদি পরিষ্কার বাতাসের লাভ টাকায় না ধরা হয়, তাহলে হয়তো তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে না।
এই ধরনের হিসাব করা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। ১৯৮১ সালে তখনকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান একটি নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সরকার যখন নতুন নিয়ম করবে, তখন তার খরচ আর লাভ দুটোই হিসাব করতে হবে। যদি খরচ বেশি হয় আর লাভ কম হয়, তাহলে সেই নিয়ম না করাই ভালো।
তখন এক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেছিলেন, যদি বায়ুদূষণ কমানোর নিয়মে খুব কম মানুষ বাঁচে কিন্তু অনেক টাকা খরচ হয়, তাহলে সেই টাকা অন্য জায়গায় খরচ করা ভালো। যেমন, হাসপাতালগুলোকে দেওয়া যেতে পারে, যাতে হৃদ্রোগের চিকিৎসা আরও ভালো হয়।
কিন্তু অনেক মানুষ এতে আপত্তি করেছিলেন। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমালোচকেরা বলেছিলেন, মানুষের জীবনের দাম টাকায় মাপা ঠিক না। একজন মানুষের জীবনকে কেবল টাকা দিয়ে বিচার করা যায় না।
মজার বিষয় হলো, এখনকার ইপিএ বলছে তারা জীবনের দাম নির্ধারণ করবে না। এই দিক থেকে দেখলে, তাদের অবস্থান কিছুটা সেই সমালোচকদের কথার সঙ্গে মিলেও যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়; যদি জীবনের মূল্য টাকায় না ধরা হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কীভাবে? এখানেই পুরো বিতর্কটা।
১৯৮০ এর দশকে ইপিএ একটি নতুন ধারণা ব্যবহার করতে শুরু করে। এর নাম ছিল “পরিসংখ্যানগত জীবনের মূল্য”। সহজ করে বললে, এটি কোনো নির্দিষ্ট মানুষের আসল মূল্য নয়। এটি একটি গড় হিসাব। মানে, ঝুঁকি কমালে কতগুলো জীবন বাঁচতে পারে; সেই হিসাব।
এর আগে কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, যদি কেউ মারা যায় তাহলে তার পরিবারের আয় কমে যাবে। তাই জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে তার ভবিষ্যৎ আয় দিয়ে। ধরা যাক, একজন মানুষ যত বছর কাজ করতেন, সেই সময়ের মোট আয়ের হিসাব করলেই তার জীবনের অর্থমূল্য পাওয়া যাবে।
এটা ভাবার পেছনে একটা যুক্তি ছিল। আমরা কাজ করে টাকা পাই। মানে আমরা আমাদের সময় বিক্রি করি। তাহলে সেই সময়ের বাজারদাম আছে। পুরো জীবনের বাকি সময়ের দাম হিসাব করলেই জীবনের মূল্য পাওয়া যায়; এমনটাই ভাবা হয়েছিল। এই পদ্ধতিকে বলা হয় “মানব পুঁজি পদ্ধতি”।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল। যদি কেউ বেতনভুক্ত কাজ না করেন? যেমন, একজন মা যদি ঘরে থেকে সন্তান লালন-পালন করেন? বা একজন বৃদ্ধ মানুষ, যিনি আর কাজ করেন না? অথবা অসুস্থ কেউ? তাহলে কি তাদের জীবনের মূল্য শূন্য? কারণ তাদের কোনো বাজারমূল্যের মজুরি নেই।
অর্থনীতিবিদেরা বললেন, এটা ঠিক না। একজন মানুষের আয় আর একজন মানুষের মূল্য এক জিনিস নয়।
২০০৫ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থমাস শেলিং এই বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। তিনি বলেন, আমরা জীবনের মূল্য ভিন্নভাবে দেখি। যদি আমরা নির্দিষ্ট কাউকে চিনি; যেমন বাদামি চুলের ছয় বছরের একটি ছোট মেয়ে, তাকে বাঁচাতে অনেক মানুষ টাকা দেবে। কারণ আমরা তাকে কল্পনা করতে পারি। আমরা তার জন্য কষ্ট পাই।
কিন্তু যদি বলা হয়, হাসপাতাল উন্নত করতে কর বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কিছু অজানা মানুষ বাঁচে। তখন অনেকেই রাজি হন না। কারণ এখানে কেউ নির্দিষ্ট নয়। আমরা জানি না কে বাঁচবে। এটা হলো “পরিসংখ্যানগত জীবন”। মানে এমন একজন মানুষ, যার পরিচয় আমরা জানি না। সে হয়তো ভবিষ্যতে আপনি-আমি-যে কেউ হতে পারি।
শেলিং বলেছিলেন, নীতি ঠিক করার সময় আসল প্রশ্ন হলো; আমরা অজানা একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে কত টাকা খরচ করতে প্রস্তুত? কারণ শেষ পর্যন্ত সেই অজানা মানুষটি হয়তো আমরা নিজেরাই হতে পারি।
এখানেই পুরো আলোচনার আসল ভাবনা লুকিয়ে আছে।
শেলিং একটি সহজ বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন। আমরা সবাই প্রতিদিন কিছু না কিছু ঝুঁকি নেই। যেমন, আমরা গাড়িতে উঠি। আমরা জানি, দুর্ঘটনা হতে পারে। তবুও আমরা চলাচল করি।
এখন ভাবা যাক, যদি গাড়িতে আরও ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বসানো হয়, তাহলে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঝুঁকি একটু কমে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা বসাতে টাকা লাগে। প্রশ্ন হলো, মানুষ ঝুঁকি একটু কমাতে কত টাকা দিতে রাজি?
এইভাবে হিসাব করা যায়। ধরা যাক, এক লাখ মানুষ আছে। তারা প্রত্যেকে ১০০ ডলার দিতে রাজি, যাতে তাদের সবার মধ্যে গড়ে একজনের মৃত্যুঝুঁকি কমে। তাহলে মোট খরচ হলো ১ কোটি ডলার। মানে, একটি সম্ভাব্য মৃত্যু ঠেকাতে ১ কোটি ডলার খরচ হলো। এভাবেই “পরিসংখ্যানগত জীবনের মূল্য” বা ভিএসএল বের করা হয়।
এটি কোনো নির্দিষ্ট মানুষের দাম না। এটি বলে, মানুষ ঝুঁকি কমাতে কত টাকা খরচ করতে রাজি।
ইপিএ আগে এই ভিএসএল ব্যবহার করত। তারা প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন ডলার ধরে হিসাব করত, যা এখনকার দামে প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার। এই সংখ্যা এসেছে গবেষণা থেকে। দেখা হয়েছিল, যে কাজগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে শ্রমিকেরা কত বেশি বেতন দাবি করেন। বেশি ঝুঁকি মানে বেশি মজুরি। সেই পার্থক্য থেকেই হিসাব করা হয়েছে।
একটি গবেষণায় দেখা হয়েছিল, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সময় মৃত্যুহার বাড়লে মার্কিন সেনাবাহিনী নতুন সৈনিকদের কত বেশি সাইনিং বোনাস দিত। ঝুঁকি বাড়লে টাকা বাড়ত। এখানেও একই যুক্তি কাজ করেছে।
ব্রিটেনে তারা একটু অন্যভাবে হিসাব করে। তাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএস “কোয়ালি” পদ্ধতি ব্যবহার করে। এখানে শুধু কত বছর বাঁচবে তা দেখা হয় না। দেখা হয়, সেই বছরগুলো কেমন যাবে। যদি কোনো চিকিৎসা মানুষকে অনেক বছর বাঁচায় কিন্তু প্রচণ্ড কষ্ট দেয়, তাহলে তার মূল্য কম ধরা হতে পারে। আর যদি কম কষ্ট দিয়ে ভালো জীবন দেয়, তাহলে সেটির মূল্য বেশি ধরা হয়।
এখানে আরও একটি বিষয় দেখা হয়। শিশুদের বাঁচালে তারা সামনে অনেক বছর বাঁচতে পারে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে সেই সময় কম। তাই হিসাবের দিক থেকে শিশুদের সুরক্ষা বেশি মূল্যবান ধরা হয়।
এসব আসলে কঠিন এক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা। সরাসরি বলা যায় না, একটি জীবনের দাম কত। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট; মানুষ বাঁচতে চায়। মানুষ নিজের জীবন রক্ষা করতে টাকা খরচ করতে রাজি থাকে।
যদি কোনো হিসাবই না করা হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়। সরকারকে নিয়ম বানাতে হয়। সেখানে খরচ মাপার জন্য একটা মানদণ্ড দরকার। অর্থনীতিবিদেরা যখন জীবনের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন করেন, অনেকেই ভাবেন তারা নির্মম। কিন্তু এই প্রশ্ন একেবারে না করলে, ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে। আর সেই ভুলের ফল আরও ভয়াবহ হতে পারে।











