দেশের সাধারণ মানুষের পকেটে যে টান পড়ছে, তা এখনই শিথিল হচ্ছে না। সংসদ নির্বাচনের আমেজ আর বাজারের আগুনের মাঝে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নতুন বছরের প্রথম (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে।
এই নীতির মূল বার্তাটি স্পষ্ট; যতক্ষণ পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামবে, ততক্ষণ সুদের হার কমানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রানীতির এই লড়াই আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভাকক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় অর্ধেকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
সাধারণত বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লে মানুষের হাতে টাকা আসে এবং কেনাকাটা বাড়ে, যা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সংকোচনমূলক’ নীতি বজায় রেখেছে। নীতি সুদহার বর্তমানে ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করা এখনও ব্যয়বহুল।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও চড়া সুদহারের কারণে বেসরকারী ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০ বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ৮.৫ শতাংশ করা হয়েছে (আগের বার ছিল ৭.২ শতাংশ)। তবে বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৬.১০ শতাংশ।
মানে হলো, চড়া সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন করে ঋণ নিতে খুব একটা আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ এক প্রকার বন্ধই বলা চলে। অবশ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে এই চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি বৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ।
মুদ্রানীতি ঘোষণায় আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সব সূচকে আমরা দুর্দান্ত করেছি। কিন্তু একটি লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে হুট করে ‘গুলি ছোড়া’ (নীতি পরিবর্তন করা) ঠিক হবে না।
অর্থাৎ যতক্ষণ সুদের হার কমছে না, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের জন্য গৃহঋণ বা ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার ঋণ নেওয়া বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল থেকে যাবে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমাতে সরবরাহ পরিস্থিতি, সিন্ডিকেট ও সরকারের কঠোর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নজর নীতি সুদহারের দিকেই বেশি। এছাড়া রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে ডলারের বিনিময় হারও কমতে দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডলারের দাম যাতে না কমে; এজন্য ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত মার্কিন ডলার কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৪১৫ কোটি ডলারের বেশি কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারের দাম না কমায় আমদানি করা খাদ্যপণ্যের দামও কমছে না।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে রাখার এই ‘সংকোচনমূলক’ নীতি বজায় রাখবে।
সহজ কথায়, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে টাকা ‘শুষে নেওয়ার’ নীতি নিয়েছে; যাতে মানুষ খরচ কম করে এবং বাজারের চাহিদা কমে। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক দিক হলো, যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন তাদের চড়া সুদের বোঝা আরও কিছুদিন বইতে হবে। যারা নতুন ঘরবাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য লোন নিতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ৭ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় না পৌঁছানো পর্যন্ত এই ‘কঠিন ঔষধ’ খেয়েই যেতে হবে দেশের অর্থনীতিকে।
মুদ্রানীতির অন্যতম স্বস্তির জায়গা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গভর্নর জানান, গত আগস্ট থেকে আইএমএফ-এর দেওয়া সব শর্ত মেনেই রিজার্ভের স্তর রক্ষা করা হচ্ছে, যা আগে কখনোই সম্ভব হয়নি। এই স্থিতিশীলতার কারণেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান বর্তমানে স্থির আছে, যা আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে দিচ্ছে না।
দায়িত্ব পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা পেলেও ব্যাংকিং খাতের আইন সংশোধনে দেরি হওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন গভর্নর। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন না হওয়াকে তিনি বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। আগামী নির্বাচনে যে সরকারই আসুক, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এই সংস্কারগুলো জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
ডিসিসিআই-এর মতে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (৬.১%) পর্যায়ে নেমে আসা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। উচ্চ সুদহার ও ঋণের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ব্রড-মানি বা বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে সংকোচনমূলক এই মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; গত ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪%, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সোমবার এক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি জানায়, দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং এটি উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ঢাকা চেম্বার মনে করে, এমন অতি-সংকোচনমূলক নীতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই আগামী নির্বাচিত সরকারের কাছে নীতি সুদহার কমানোসহ একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব মুদ্রানীতি প্রত্যাশা করে সংগঠনটি, যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।











