জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হস্তক্ষেপ চেয়ে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন ব্যবসায়িক নেতারা।
তাদের আশঙ্কা, বন্দরের চলমান অচলাবস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
শনিবার দেওয়া ওই খোলা চিঠিতে তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা নিয়ে বিরোধ চলছে। এর জেরে ঘোষিত ধর্মঘট এবং বন্দর কার্যক্রম বন্ধের কর্মসূচি শিল্প, বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশ একটি ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের দুয়ারে।
চিঠিতে ব্যবসায়ীরা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশংসা করেন।
তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সরকারের অঙ্গীকার এখন চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী চার দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে যে গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে, এর সঙ্গে তারা পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এই প্রেক্ষাপটেই ব্যবসায়ীরা গভীর উদ্বেগের কথা জানান।
তাদের ভাষায়, যখন সমগ্র জাতি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ঠিক তখনই দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে গভীর অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে আগামীকাল (রবিবার) থেকে লাগাতার ধর্মঘট এবং বন্দর ইয়ার্ডে পণ্য ওঠানামা বন্ধের ঘোষণায় শিল্প ও বাণিজ্য খাতে তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দরে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিক ও কর্মচারী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সম্মুখসারির সৈনিক। তাই নির্বাচনকালীন এই সংবেদনশীল সময়ে শিল্প, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আন্দোলনকারী পক্ষ ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাধানের পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
ব্যবসায়ী নেতারা জানান, গত সাত দিন ধরে তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ ও সমন্বয় সভা করে আসছেন। কিন্তু আস্থার সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বরং আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বন্দরের ইয়ার্ডে পণ্য ওঠানামা ও খালাস বন্ধের ঘোষণা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।
ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন এবং ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথে বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
এ ছাড়া আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী জাহাজ খালাস না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যা দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দেবে বলে সতর্ক করেন তারা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বন্দরে জাহাজ জট ও কার্যক্রম স্থগিত থাকার কারণে প্রতিদিন আমদানিকারকদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ‘ডেমারেজ চার্জ’ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত বিরোধটি বর্তমানে বন্দর কর্মচারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সংঘাতপূর্ণ অবস্থার দিকে এগোচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্তের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
চিঠির শেষে ব্যবসায়ী নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হোক, এটি কেউই কামনা করেন না। এই পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত ও সরাসরি হস্তক্ষেপ তারা একান্তভাবে প্রত্যাশা করছেন।
চিঠিতে বলা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সব পক্ষই আপনার বিজ্ঞ সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। একমাত্র আপনার বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনাই এই সংকটময় অচলাবস্থা নিরসন করে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারে।”
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খসরু রহমান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
প্রসঙ্গত; এই সংকটের গভীরে রয়েছে দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার বিতর্ক এবং এর সাথে জড়িত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী লজিস্টিকস কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত টার্মিনালগুলোর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সংযুক্ত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং ইউএই-ইসরায়েল বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে সমীকরণ, তা নিয়ে বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা নিছক শ্রমিক আন্দোলন নয়; এটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে বিদেশি প্রবেশের যে বিশাল পরিকল্পনা, তারই একটি বড় ধাক্কা।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বন্দর সচল করা নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ১০ ব্যবসায়ী সংগঠন নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে। বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত বৈঠক থেকে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ-সহ ১০টি সংগঠনের নেতারা এক যৌথ বিবৃতি দেন।
এতে বলা হয়, “চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরল সংকট। বন্দর এক দিন বন্ধ থাকা মানেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি।”











