জাপানের সঙ্গে ইপিএ, বাণিজ্য কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত

ডিএসজে
ডিএসজে

বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে সূচনা হলো এক নতুন দিগন্তের। চার বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।

শুক্রবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো দেশের সাথে স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। এটি কেবল পণ্য বিনিময় নয়, বরং বিনিয়োগ এবং সেবা খাতের অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করবে।

এক তথ্য বিবরণীতে বাংলাদেশ তথ্য অধিদফতর চুক্তির বিষয়টি জানিয়েছে।

জাপান-বাংলাদেশের এই চুক্তিটি হুট করে আসেনি। ২০২২ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে ইপিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু হয়। ঢাকা ও টোকিওতে মোট সাত দফা বিস্তারিত আলোচনার পর আজ এর চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর যে বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ আসার কথা ছিল, এই ইপিএ তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ‘বর্ম’ হিসেবে কাজ করবে।

ইপিএ স্বাক্ষরের ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৭,৩৯৮টি পণ্যের ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বহুল প্রতীক্ষিত ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে কাঁচামাল যে দেশেরই হোক, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কোনো জটিল শর্ত ছাড়াই জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

এছাড়া জাপানের সেবা খাতের দরজাও বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। জাপানের আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং এবং কেয়ারগিভিংসহ ১৫টি বিভাগের ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

Jap BD

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশও জাপানের জন্য তার বাজার উন্মুক্ত করেছে। ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাতে ১,০৩৯টি জাপানি পণ্যকে পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে ঢাকা। এতে বাংলাদেশে জাপানি গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স ও ভারী যন্ত্রপাতির দাম নাগালে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া জাপানের ৯৭টি সেবা খাত বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩.২ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে জাপানে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ওই অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইপিএ কার্যকর হওয়ার পর আগামী ৫ বছরে দুই দেশের বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।

ইপিএ স্বাক্ষরের ফলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, আড়াইহাজার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং লজিস্টিকস খাতে জাপানি সরাসরি বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়বে, এমন আশা করা হচ্ছে।

চুক্তি স্বাক্ষর শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের উজ্জল অর্থনৈতিক ভবিষ্যত এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যে গভীর পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন পারস্পরিক সমৃদ্ধির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইপিএ কার্যকর হওয়ার পর জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বছরে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০২৬ সালের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে শুল্ক সুবিধার ঝুঁকি তৈরি হবে, জাপান তার একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠবে। ইপিএ স্বাক্ষরের ফলে জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া ৭,৩৯৮টি পণ্যের মধ্যে বিশেষ সম্ভাবনাময় ৫টি খাত হচ্ছে তৈরী পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হস্তশিল্প ও পাটজাত পণ্য।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top