দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে গভীর সংকটের আশঙ্কা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে রপ্তানি আয় ও ক্রয়াদেশ ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে আসন্ন ঈদ, সরকারি ছুটি ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের অতিরিক্ত চাপ শিল্পটিকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ছয় মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের সমপরিমাণ ‘সফট লোন’ বা স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধা প্রদানের জোরালো দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে সচিবালয়ে বিজিএমইএ-র একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এই দাবি জানানো হয়। বিজিএমইএ-র সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ছিলেন সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান এবং পরিচালক ফয়সাল সামাদ।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ পোশাকশিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি তুলে ধরে রপ্তানি সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত ও জরুরি আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানান। বিদ্যমান সংকটে সময়মতো এই আর্থিক সহায়তা না এলে বহু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানি সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল অর্থসচিবকে জানান যে, আগামী ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে এই শিল্পে নজিরবিহীন তারল্যসংকট দেখা দেবে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সরকারি ছুটি, নির্বাচন ও ঈদের কারণে কারখানা মাত্র ৩৫ দিন খোলা থাকতে পারে। কিন্তু মার্চ মাসে নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি বোনাস এবং অগ্রিম বেতন মিলিয়ে কারখানাগুলোকে প্রায় দ্বিগুণ মজুরি পরিশোধ করতে হবে।
এই বাড়তি অর্থের সংস্থান করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) কারখানাগুলোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে এবং শিল্পকে সচল রাখতে ছয় মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ‘সফট লোন’ হিসেবে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
পোশাক খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে ২.৪৩ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ৯.৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ইউনিট প্রাইস বা দাম কমে যাওয়ার কারণে গত এক বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিজিএমইএ নেতারা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না দিলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে বড় ধরনের বেকারত্ব তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল অভিযোগ করেন যে, লিয়েন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণ নগদ সহায়তার আবেদন বকেয়া পড়ে আছে। এই বকেয়া অর্থ দ্রুত ছাড় করা হলে কারখানাগুলোর ‘ক্যাশ-ফ্লো’ বা নগদ অর্থের প্রবাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।
বৈঠকে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার দেশের অর্থনীতির এই প্রধান চালিকাশক্তিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেন।













