পুঁজিবাজারের অস্থিরতা দমনে ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার কথা ছিল ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ)। কিন্তু প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এই তহবিল বাজারে ব্যবহারের পরিবর্তে স্রেফ ‘ব্যাংক আমানত’ করে রাখার পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার।
‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া সূত্রে এমনটাই জানতে পেরেছে ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল (ডিএসজে)। খসড়ার অনুলিপি এই প্রতিবেদকের হাতে আছে।
খসড়াটি দেখার সুযোগ পাওয়া বাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, নতুন আইনের কঠোর ও রক্ষণশীল ধারাগুলো সিএমএসএফ-এর মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই তহবিল আদৌ বাজারের স্থিতিশীলতায় কোনো ভূমিকা রাখবে, নাকি অলস অর্থের পাহাড় হয়ে ব্যাংকে পড়ে থাকবে?
২০২১ সালে যখন সিএমএসএফ গঠিত হয়, তখন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল, তহবিলটি ‘মার্কেট মেকার’ হিসেবে বাজারের বড় ধসের সময় শেয়ার কিনে পতন ঠেকাবে। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশের খসড়া বলছে ভিন্ন কথা। তহবিলের সমস্ত নগদ অর্থ ব্যাংকে রাখতে হবে এবং সমস্ত শেয়ার এর নিজস্ব ‘ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্ট’ (ডিপি) অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে।
যার অর্থ হলো, সিএমএসএফে থাকা নগদ অর্থ ও শেয়ার পুঁজিবাজারের লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে না। যদিও পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে শেয়ার কিনতে হয়, যা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) করে থাকে।
বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, নতুন আইন অনুযায়ী তহবিলটি যদি ব্যাংকে অলস পড়ে থাকে, তবে বাজারের বড় ধসের সময় এটি ‘দর্শক’ ছাড়া আর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে না। মূলত বাজার যখন তারল্য সংকটে ভুগবে, সিএমএসএফ তখন সুদ বা মুনাফা গুনতে ব্যস্ত থাকবে। অবশ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আর্থিক সাক্ষরতা কার্যক্রম এবং গবেষণা পরিচালনা করতে তহবিলটি থেকে অর্থ নেওয়া যাবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, “তহবিলের নগদ অর্থ ও শেয়ার অক্ষত থাকবে কারণ এটা ইনভেস্টরের রাইট শেয়ার, লভ্যাংশের টাকা। এটা একদম প্রটেক্টেড, কাস্টোডিয়ানের কাছে থেকে যাবে। বর্তমান সরকার, বিএসইসির কমিশনসহ সবার বক্তব্য ছিল যে পাবলিকের টাকা দিয়ে মার্কেট স্ট্যাবিলাইজ করা যাবে না। যেহেতু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, সে ক্ষেত্রে তহবিলটির লোকসানের সম্ভাবনাও থাকে।”
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “ব্যাংক হিসাবে থাকা আমানত থেকে যে সুদ আসবে, তা দিয়ে প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো হবে। এরপরও যদি বাড়তি টাকা থাকে, তা দিয়ে বিনিয়োগ শিক্ষা, অ্যাওয়ারনেসে ব্যয় করা হবে।”
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “এই তহবিলের অর্থ ও শেয়ারের মালিকানা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের, যাঁরা প্রমাণসাপেক্ষে দাবি জানালে তা ফেরত দিতে হবে।” যেহেতু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, তাই তহবিলটি সুরক্ষিত রাখতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।
এদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতামত হচ্ছে, স্থিতিশীলতা তহবিলের কাজ হলো বাজারে তারল্য সরবরাহ করা, ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখা নয়। কিন্তু সিএমএসএফ-এর নতুন অধ্যাদেশটি মূলত আমানত সুরক্ষায় বেশি মনোযোগী, বাজার সুরক্ষায় নয়।
অন্তত ১০ শতাংশের কম অর্থ বাজারে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা যদি কর্মকর্তাদের না থাকে, তবে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এই তহবিল বিনিয়োগকারীদের কোনো কাজে আসবে না। ফলে একটি ‘মৃত তহবিল’ বা ‘ডেড ফান্ড’ হওয়ার পথেই হাঁটছে সিএমএসএফ।
বোর্ড গঠন ও দায়মুক্তি
খসড়া প্রবিধান অনুযায়ী, এই তহবিলের বোর্ড অব গভর্নরস সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে, যেখানে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বোর্ডের অন্য সদস্যরা হবেন—বিএসইসির একজন কমিশনার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি)-এর সভাপতি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তহবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
খসড়া অধ্যাদেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত দিক হলো ‘গুড ফেইথ’ বা সরল বিশ্বাসের সুরক্ষা। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সদুদ্দেশ্যে এই নিয়ম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে সরকার, সরকারি কর্মকর্তা, বিএসইসির চেয়ারম্যান, কমিশনার ও কর্মকর্তা, তহবিলের বোর্ড অব গভর্নরস এবং এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ নতুন অধ্যাদেশের ‘গুড ফেইথ’ বা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত। তেমনই এক বিনিয়োগকারী হুমায়ুন আহমেদ ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “যদি কর্মকর্তারা সদুদ্দেশ্যের দোহাই দিয়ে আমাদের টাকা বিনিয়োগ না করে অলস ফেলে রাখেন আর বাজার আরও পড়ে যায়—তবে তার দায় কে নেবে? আইন তো তাঁদের আগেভাগেই মাফ করে দিয়েছে। আমরা তবে কার কাছে বিচার চাইব?”
আরেক বিনিয়োগকারী শফিউল আলম ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “বিএসইসি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের শক্তিশালী বোর্ড গঠিত হলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁরা মূলত একটি ‘রিফান্ড অফিস’ হিসেবেই কাজ করবেন।” তাঁর জিজ্ঞাসা, “তহবিলের টাকা ব্যাংকে রেখে যে মুনাফা হবে, তার সুফল কি লভ্যাংশবঞ্চিত সাধারণ বিনিয়োগকারী পাবেন, নাকি তা কেবল প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতেই শেষ হবে?”
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, তহবিলের আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (আইএফআরএস) অনুসরণ করে প্রস্তুত করতে হবে এবং অর্থবছর শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে এর নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
২০২১ সালে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের অবণ্টিত নগদ ও স্টক লভ্যাংশ, ফেরত না দেওয়া পাবলিক সাবস্ক্রিপশনের অর্থ এবং বরাদ্দহীন রাইট শেয়ার জমা রাখার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই সিএমএসএফ গঠন করেছিল।
তহবিলে জমা থাকা নগদ অর্থ এবং শেয়ারগুলো যেকোনো সময় শেয়ারহোল্ডার বা বিনিয়োগকারীদের যাচাইকৃত দাবির ভিত্তিতে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ দাবি না করছেন, ততক্ষণ এই তহবিল পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কাজে ব্যবহার করার কথা।













