সরকারি ঋণে বন্দী বিশ্ব অর্থনীতি, কেন?

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি এখন আর আগের মতো নেই। এ বছর এটি সরকারগুলোতে চলে এসেছে। অনেক দেশে রাজনৈতিক কারণে প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খাচ্ছে। এর ফলে সরকারকে সঞ্চয় পরিকল্পনা বাতিল করে, বড় বাজেট ঘাটতি সাপোর্ট করে রাজস্ব প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হচ্ছে।

ধীরগতির অর্থনীতির ইউরোপ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ার কিছু অংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চাহিদা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ব্যয়বহুল উদ্যোগগুলো স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াবে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, এআইয়ে বিনিয়োগের ফলে আগামী ছয় মাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কম বেকারত্ব এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হারের সময়ে এ ধরনের কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জাপানে কিন্তু এরই মধ্যে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী মাসে আকস্মিক আগাম নির্বাচনের আগে সরকারি ব্যয় বাড়ানো ও ভোগ কর কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর ফলে গত সপ্তাহে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এই বিক্রির (বন্ড বা শেয়ার) চাপ ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক বাজারেও। আর এতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারও বেড়ে যায়।

অবশ্য একে একটা সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন লন্ডনভিত্তিক ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নীল শিয়ারিং। তার মতে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা উন্নত অর্থনীতিগুলোর ভেতরকার জমে থাকা ভঙ্গুরতার চিহ্ন বা উপসর্গ। আর এসব ভঙ্গুরতার মধ্যে রয়েছে বেসরকারি খাতে দুর্বল চাহিদা ও নিম্ন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্রতর করার হুমকি দিচ্ছেন, তখন ইউরোপের অর্থনীতি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ সরকারি ব্যয় ছাড়া প্রবৃদ্ধির বিকল্প উৎস সেখানে খুবই সীমিত।

বিশ্বের প্রথম ও তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি; যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে এ বছর রাজস্ব প্রণোদনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করবে বলে হিসাব করেছেন অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক। চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি জাপানে এই প্রণোদনা প্রবৃদ্ধি বাড়াবে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট। আর চীন টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ সমপরিমাণ সম্মিলিত বাজেট ঘাটতি চালাতে যাচ্ছে, যা দেশটির প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হারের প্রায় দ্বিগুণ।

সরকারি অর্থের এই বিশাল ঢেউ ক্রমবর্ধমান নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যেই তৈরি। রাজনীতিকরা এমন সব প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে চাইছেন, যাদের ব্যবসায়িক মডেল এআই, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও চীনের ভর্তুকিপ্রাপ্ত রপ্তানির চাপে হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অনেক দেশ অনিশ্চিত হয়ে ওঠা বিশ্বে সামরিক পুনর্সজ্জায়, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের অর্থায়নে কিংবা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে ধাবিত জনসংখ্যার যত্ন নিতে বিপুল ব্যয় করছে।

আগে এমন পরিস্থিতিতে সমাধান মানেই ছিল কর বাড়ানো, শুধু বাজেট ঘাটতি বাড়ানো নয়। কিন্তু আজকের নেতারা ভোটারদের হাতে সেই বিল তুলে দিতে অনিচ্ছুক।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উন্নত অর্থনীতিগুলোতে গড় বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আর উদীয়মান বাজারগুলোতে এটি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি এক দশক আগে ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৬ ও ৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই বছর অনেক খরচ করবে। কিন্তু কর তুলনামূলকভাবে কম রাখার কারণে বাজেট ঘাটতি প্রায় ৬ শতাংশ হবে। গত ১৬ জানুয়ারি গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাসে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এ বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে, যা গত বছরের প্রায় ২ শতাংশ থেকে বেশি। কারণ শুল্কজনিত চাপ কমে গিয়ে করছাড়ের ইতিবাচক প্রভাব সামনে আসছে।

জার্মানিতে সরকার প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে এক ট্রিলিয়ন ইউরো ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দেশটিতে করহার ইতিমধ্যেই উন্নত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উচ্চ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আরও কর বাড়ানো হয়, তাহলে দেশের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে, কারণ বেশি কর ব্যবসা ও বিনিয়োগকে চাপ দেবে।

তবে জার্মানির সরকারি ঋণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এটি এক ব্যতিক্রম। করোনা মহামারির সময় ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর কিছুটা কমলেও, আইএমএফের গত অক্টোবরের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ অতিক্রম করবে। এটি হবে ১৯৪৮ সালের পর সর্বোচ্চ স্তর।

২০২২ সালের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের তখনকার প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস যখন অর্থায়নবিহীন করছাড়ের প্রস্তাব দেন, তখন বন্ড বাজার প্রায় পুরোপুরি থমকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে হয়। অন্যদিকে ফ্রান্সে গত দুই বছরে সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর সরকার বাজেট পাস করাতে হিমশিম খেয়েছে।

তবে এবার ২০১০ সালের ইউরোজোন ঋণ সংকটের মতো বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের পলায়ন দেখা যায়নি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতির অধ্যাপক রিকার্ডো রেইস বলছেন, মহামারির সময় সরকারগুলো শিখেছে যে সরকারি ব্যয় বাড়ালেও সঙ্গে সঙ্গে বড় সমস্যা হয় না। যদিও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, স্বল্পমেয়াদে তা ঋণ পরিচালনাকে তুলনামূলকভাবে সহজ করেছে।

এই বিপুল ব্যয় একটি কৌশলগত পরিবর্তনের সংকেত। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর অনেক দেশ, বিশেষ করে ইউরোপ বিনিয়োগকারীদের শান্ত করতে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেখানকার নেতারা বুঝতে পেরেছেন, কৃচ্ছ্রসাধন শুধু জনপ্রিয় নয়, বরং দুর্বল সামরিক শক্তি ও ভঙ্গুর অবকাঠামোর জন্ম দিয়েছে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রভাব সামরিক ব্যয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটিয়েছে—শুধু ইউরোপে নয়। কানাডার পার্লামেন্ট নভেম্বর মাসে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১৪০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) নতুন ব্যয় অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপের মোকাবেলায় কানাডার অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য একটি “প্রজন্মকালীন বিনিয়োগ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই প্যাকেজে বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং অন্যান্য বাণিজ্য অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ রয়েছে, যার লক্ষ্য আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাজারে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করা। এর ফলে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশে পৌঁছাবে, যা আগের বছরের ১.৬ শতাংশ থেকে বেড়েছে।

প্রতীকী চিত্র

প্রতীকী চিত্র

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ সামরিক ব্যয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন শুধু ইউরোপেই ঘটনায়নি। কানাডার পার্লামেন্ট গত নভেম্বরে আগামী পাঁচ বছরে ১৪০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) নতুন ব্যয় অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপের মুখে কানাডার অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য একটি “প্রজন্মকালীন বিনিয়োগ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই প্যাকেজে বন্দর ও অন্যান্য বাণিজ্য অবকাঠামো আধুনিকায়নের অর্থ রয়েছে। এর লক্ষ্য আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাজারে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করা। ফলে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে, আগের বছরের ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে।

কানাডার পার্লামেন্টের সাবেক বাজেট কর্মকর্তা সাহির খানের মতে, ভূরাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই। অনেক বদলে গেছে। ট্রাম্পের নীতির কারণে কানাডা এখন তার সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে।

জাপান সরকার গত নভেম্বরে জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ সমপরিমাণ একটি রাজস্ব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ কমানো এবং বিনিয়োগ ও সামরিক ব্যয় বাড়ানো।

ইউরোপজুড়ে এমনকি যে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো একসময় কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার পক্ষে কথা বলত, তারা এখন বেশি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমর্থন বাড়াচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফ্রান্সের ন্যাশনাল র‍্যালি অবসর বয়স বাড়ানোর বিরোধিতা করছে। আর জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মানি দল পেনশন ভাতা বাড়াতে চাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী বড় বাজেট ঘাটতি দেখা দেয় একদিকে সামাজিক নিরাপত্তায় উচ্চ ব্যয়, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর কমানোর উদ্যোগের কারণে। যদিও বেশি ফেডারেল ঋণ সুদের হার বাড়ায় এবং অর্থনীতির আকার ছোট করতে পারে।

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ওয়েন্ডি এডেলবার্গ বলছেন, “আমার মনে হয় এই প্রভাবগুলো খুব বড় নয়।” তার মতে, বন্ড বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট সম্পদ আছে ঋণ বহন করার জন্য। বিশেষ করে যখন করহার তুলনামূলকভাবে কম। ফলে চূড়ান্ত হিসাব চুকানোর দিন এতটাই দূরে যে তা নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই।

সাম্প্রতিক উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ঋণের খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সরকারি ঋণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ গত চার বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। জার্মানি ও জাপানেও একই সময়ে সরকারি ঋণ সার্ভিসিংয়ের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

যখন ব্যয় অর্থায়ন ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে, অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, কিছু সরকার শেষ পর্যন্ত কর বাড়াতে বা ব্যয় কমাতে বাধ্য হবে। আর এর সূচনা হতে পারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহানি থেকে, যাতে তারা সরকারের ঋণ শোধের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। অথবা এআইয়ের অর্থনৈতিক সুফল পুনর্বিবেচনা থেকে, বলছেন আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতির অধ্যাপক রিকার্ডো রেইস বলেন, “আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন। সুদ পরিশোধের বিল ঐতিহাসিক যে কোনো তুলনায়ই খুব উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।”

তথ্যসূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top