বন্ধক জালিয়াতি রুখবে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার়

ছবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতীক
ছবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতীক

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম নীরব অস্ত্র—একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার পুরোনো ফাঁদ—বন্ধ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ভবিষ্যতে ‘মর্টগেজ প্রোপার্টি ডিপোজিটরি’ (বন্ধকি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার) নামে একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। একই সঙ্গে বন্ধকি সম্পদের যে মূল্য দেখানো হয়, সেটি বাস্তবসম্মত কি না, তাও যাচাই করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর স্পষ্ট ভাষায় জানান, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ অনুমোদনের আগে কোনো সম্পত্তি আদৌ বন্ধকি কি না এবং সেটি আগে থেকেই অন্য কোনো ব্যাংকে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—সব তথ্য এখন কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই করা হবে।

গভর্নর বলেন, “একটা মর্টগেজ পাঁচটা ব্যাংকে দেখানো যাবে না। যদি দেখানো হয়, তাহলে সেটা জানাতে হবে। বন্ধক নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।”

প্রসঙ্গত, সম্পদ বড় এবং ঋণের পরিমাণ তার তুলনায় কম হলে, তা একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখা যায়।

খেলাপি সংস্কৃতির শিকড়ে আঘাত

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মর্টগেজ ডিপোজিটরি চালু হলে এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়, বরং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সংস্কৃতির শিকড়ে আঘাত। বছরের পর বছর একই সম্পত্তি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও, কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ না থাকায় ব্যাংকগুলো কার্যত অন্ধের মতো ঋণ বিতরণ করেছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি মর্টগেজ বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত থাকবে এবং ঋণ বিতরণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই স্বাধীনভাবে যাচাই করবে—দেখানো সম্পদের মূল্য বাস্তবসম্মত কি না।

“এটা বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুরু করছি। সময় লাগবে, কিন্তু এটি বাস্তবায়ন করলে ঋণ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাগুলো কাটানো যাবে,” বলেন গভর্নর।

নির্বাচনেও থামবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নীতিনির্ধারণ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন গভর্নর। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক ছায়ায় নয়।

“কেন্দ্রীয় ব্যাংক নাগরিকদের সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ নেই,” বলেন তিনি। একধাপ এগিয়ে ড. মনসুর দাবি করেন, “গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক যা কাজ করেছে, তা গত ২৪ বছরে হয়েছে কি না—সেটা প্রশ্ন।”

ফরেক্স ও ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্টে নতুন এজেন্ডা

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বৈদেশিক মুদ্রা বাজার নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফরওয়ার্ড মার্কেটকে আরও গভীর ও কার্যকর করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) কোথায়—সেটা বুঝে আমাদের কাজ করতে হবে।”

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মর্টগেজ ডিপোজিটরি বাস্তবায়ন হলে এটি হবে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারগুলোর একটি। প্রশ্ন একটাই—এই ব্যবস্থার আওতায় কি আগের বড় ঋণ, বড় নাম ও বড় খেলাপিরাও আসবে? নাকি সংস্কারের খড়্গ আবারও কেবল ভবিষ্যতের ঋণগ্রহীতাদের জন্যই তোলা থাকবে?

কবে এমডি পাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক?

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে গভর্নর স্পষ্ট করেন—বল এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোর্টে। “আমরা ইন্টারভিউ নিয়ে নাম পাঠিয়ে দিয়েছি। নীতি সহায়তার ফাইল ক্লিয়ার করেছি। এখন সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, বর্তমানে ব্যাংকটি কার্যত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কারণ রেজল্যুশনের সময় সেখানে না ছিল মালিক, না ছিল বোর্ড। তবে দ্রুত এমডি নিয়োগ জরুরি বলে মত দেন গভর্নর।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top