দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অন্তত দুই থেকে তিন বছর পিছিয়ে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা। তারা পুঁজিবাজারের সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত ‘পোস্ট ইলেকশন ২০২৬ হোরাইজন: ইকোনোমি, পলিটিক্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক সেমিনারে বিনিয়োগকারীরা জানান, নীতিগত জটিলতা এবং ভালো মানের কোম্পানির অভাব বাংলাদেশের বাজারকে তলানিতে নামিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে পাকিস্তান থেকে দুই-তিন বছর এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ৩ বছরের বেশি পিছিয়ে উল্লেখ করে সুইডেনভিত্তিক টুন্ড্রা ফন্ডারের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাটিয়াস মার্টিনসন জানান, বাংলাদেশের বাজার বর্তমানে গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেনের পর্যায়ে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা যেভাবে মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে বাজারে এনে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছে, বাংলাদেশ সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে।” ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্সের (মূলধনী মুনাফা কর) বদলে লেনদেনের ওপর সামান্য শুল্ক (১০ বেসিস পয়েন্ট) আরোপের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো ভালো মানের কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসাই হবে পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেক্সচুয়াল ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাও হিরোসে স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “আমরা বিনিয়োগের আগে নিশ্চিত হতে চাই যে নির্বাচনের পর পরিবেশ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে।” তাদের মতো আন্তর্জাতিক পরামর্শকরা মনে করেন, নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতা ফিরলে বাংলাদেশ পুনরায় বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্য হতে পারে।
সেমিনারে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক আইনগুলো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পথে প্রধান অন্তরায়। তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজারমুখী সংস্কার ছাড়া এই স্থবিরতা কাটানো সম্ভব নয়।” তিনি ২০২৬ সালের পরবর্তী সংসদীয় নির্বাচনের পর একটি উদারীকরণ নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, “দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের তুলনায় পুঁজিবাজারই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে।” তাঁর মতে, বাজারে ভালো শেয়ারের সংখ্যা হাতেগোনা। তবে জেপি মরগ্যানের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ বাড়ার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। যদিও বড় বিনিয়োগকারীরা নির্বাচনের আগে পর্যবেক্ষণ নীতি অনুসরণ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা বর্তমানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব প্রক্রিয়ায় ইস্যু ব্যবস্থাপক এবং নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা বাড়াতে বিধিমালা সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বাজারনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে উচ্চমানের কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে উৎসাহিত হয়।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক তাঁর মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা আতিকুর রহমান তাঁর দলের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, তারা ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে কোনো বিশৃঙ্খল পরিবর্তন নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তববাদী ও ন্যায়বিচারভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটবেন।













