বাড়ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি

ডিএসজে আর্কাইভ
ডিএসজে আর্কাইভ

দীর্ঘদিনের ডলার সংকট ও আমদানি সংকোচনের পর দেশে আবারও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পকাঁচামালের এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ বাড়ছে। এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভোগনির্ভর আমদানি থেকে সরে এসে উৎপাদন ও বিনিয়োগমুখী ধারায় ফেরার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ খান ডিএসজেকে বলেন, “নীতি সহায়তার অধীনে যেসব শিল্পগোষ্ঠী খেলাপি থেকে বের হয়ে এসেছে বা নতুন করে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ পেয়েছে, তারা আমদানি করতে পারছে।” তবে “ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই সাবধান হতে হবে। ক্যাপিটাল মেশিনারির এলসি খুলেছি এক হাজার কোটি টাকার, বাহবা নিচ্ছি। পরে দেখা গেল ফান্ড ডাইভার্ট হচ্ছে বা ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে—এরকম ঘটনা যাতে না ঘটে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে হবে সতর্কতার সঙ্গে এবং সেই ঋণ অবশ্যই মনিটর করতে হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছে ৯১ কোটি ১০ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২.২২ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের।

মূলধনী যন্ত্রপাতি বলতে শিল্পকারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে ব্যবহৃত মেশিনারি, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিকে বোঝায়। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি মানে বিদ্যমান শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি, নতুন উৎপাদন লাইন চালুর উদ্যোগ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে অর্ডার ও ভবিষ্যত চাহিদার প্রত্যাশা। শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতি নয়, শিল্পকাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সংকেত।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের পর থেকে বাংলাদেশে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে, যা গত অর্থবছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল ৪.৮৪ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯.৪ শতাংশ কম। পরবর্তীতে তা ধারাবাহিকভাবে কমে গিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে চলতি অর্থবছরে এ খাতের সংকট কাটতে শুরু করেছে।

মূলত, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন শিল্প স্থাপন বাধাগ্রস্ত হয় এবং এই সংকট ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

তবে প্রবাসী আয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থপাচার বন্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ধীরে ধীরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে থাকে। ফলে, আমদানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২ জানুয়ারি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের বিপিএম৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৮.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের মে মাসে ছিল ১৮.৩২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিল্পকাঁচামালের এলসি খোলা হয়েছে ১ হাজার ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ২৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল—এই দুই ধরনের আমদানি একসঙ্গে বৃদ্ধি সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংকেত। কারণ, এটি কেবল পরিকল্পনা নয়, বাস্তব উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর ইঙ্গিত দেয়।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। বৈশ্বিক শুল্ক জটিলতায় চলতি অর্থবছরে টানা পাঁচ মাস (আগস্ট-ডিসেম্বর) ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমছে। সদ্য শেষ হওয়া ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪.২৫ শতাংশ। মূলত, তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পকাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার হার বৃদ্ধি বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সংকেত দেয়, যা রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ব্যাংকগুলোও দীর্ঘমেয়াদী শিল্পঋণে কিছুটা সক্রিয় হচ্ছে এবং ঋণ বিতরণে স্থবিরতা কেটে যাওয়ার আভাস মিলছে। যদিও খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির চাপ থাকায় ব্যাংকিংখাত এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।

কাঁচামাল আমদানি সাধারণত সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে, এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন সূচকে, কর্মসংস্থানে ও রপ্তানি আয়ে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি মানে আগামী কয়েক মাসে উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিল্পকাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তিও বেড়েছে। এ সময়ে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলার বেশি। অবশ্য এ সময়টাতে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ১৫ কোটি ২ লাখ ডলার কমেছে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় উদ্যোক্তারা সাধারণত নতুন মেশিন কেনা বা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন। তবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনায় শিল্প উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন। ফলে, বর্তমানে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, কারখানাগুলো শুধু সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না, বাস্তবে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে। অবশ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন হলে নতুন যন্ত্রপাতি কাজে লাগবে না।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top