ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের প্রাপ্যতা নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা যেন এক গোলকধাঁধার মতো। একদিকে বাজারে সিলিন্ডার নেই বলে হাহাকার, অন্যদিকে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই । এই বৈপরীত্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক সুপরিকল্পিত কারসাজির গল্প, যা উন্মোচন করেছেন খোদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় রোববার (৪ জানুয়ারি)। সেদিন বিকেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হয় । ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই বাজারে এক রহস্যময় সংকটের দানা বাঁধতে শুরু করে।
ওই দিনই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন, যা ডিসেম্বর মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে । এই পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও খুচরা পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করায় সেদিন সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকা জেলার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। সেখানে বাড়তি দাম নেওয়ায় এবং লাইসেন্স না থাকায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় ।
পরদিনও (৫ জানুয়ারি) বাজারের অস্থিরতা থামেনি। অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সদর উপজেলার রাধিকা বাজার এলাকায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আরেক সহকারী পরিচালক ইফতেখারুল আলম রিজভী অভিযান চালিয়ে ‘মায়ের দোয়া’ নামক একটি ডিলার প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। সেখানে দেখা যায়, ডিলার মূল্য তালিকা না ঝুলিয়েই ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন ।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সচিবালয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তিনি কঠোর ভাষায় বাজারের এই কৃত্রিম অস্থিরতার নিন্দা জানান। এলপিজির সরবরাহ নিয়ে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে উপদেষ্টা বলেন, “এলপিজির সরবরাহ সংকট নেই। সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সাময়িক সংকট আমদানি বা উৎপাদনে কোনো ব্যর্থতার কারণে নয়; বরং পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশের যোগসাজশ ও পরিকল্পিত কারসাজির ফল।”
উপদেষ্টা আরও বলেন, “প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকার বেশি দামে সাম্প্রতিক বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের শোষণ করছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি যোগসাজশের মাধ্যমে করা হয়েছে, এটি স্বাভাবিক বাজারচক্র নয়।” তিনি জানান, আন্তর্জাতিক শিপিংয়ে কিছু জটিলতা থাকলেও চলতি মাসে তার কোনো প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েনি। তাঁর ভাষায়, “চলতি মাসে এসব সমস্যার কোনো প্রভাব এলপিজি সরবরাহে পড়েনি। তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব নেই, তবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আমরা নজরে রাখছি।”
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভূমিকা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে ক্রেতা, বিক্রেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অংশগ্রহণ থাকে। সরকার ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করতে চায় না।” তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, “আমরা মনে করি এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি এবং ধীরে ধীরে দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।”
উপদেষ্টার এই বক্তব্যের দিন বিকেলেই নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি অভিযান পরিচালিত হয়। সেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করায় একটি দোকানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় ।













