ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
বাংলাদেশ নির্ভর করছে বিশ্ব রাজনীতি ও মার্কিন শুল্কনীতির ওপর। দেশটির শুল্কনীতিতে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে সুবিধাজনক অবস্থানে মনে হলেও আদতে পেছনের সারিতেই রয়ে গেছে। রপ্তানি আয়ের তুলনা করলে, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কমে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বার্ষিক হিসাবে; যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে, ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। রোববার (৪ জানুয়ারি) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মাসিক ভিত্তিতে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশের একটি ছোট ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও, সামগ্রিক চিত্রটি ছিল বেশ উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের এই নিম্নগামী প্রবণতা যখন স্পষ্ট হচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো বিশ্ববাজারে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে। এর পেছনে বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং চীনের বাজার কৌশলের বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। কিন্তু সম্প্রতি দেশটির মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে এবং বর্তমানে কোনো বিশেষ শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) পাচ্ছে না, সে কারণে মার্কিন শুল্কের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামের ওপর।
মার্কিন শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ল্যান্ডিং কস্ট বা আমদানিকারকের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে, অনেক মার্কিন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে এমন দেশগুলোতে নিয়ে যাচ্ছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রয়েছে অথবা যাদের ওপর শুল্কের হার তুলনামূলক কম।
প্রতিযোগীদের রপ্তানি বৃদ্ধি যে কারণে
যখন বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন ভিয়েতনাম, ভারত ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে তাদের হিস্যা বাড়াচ্ছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো: চীনের বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন যখন চীন থেকে সরানোর চেষ্টা চলছে, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম তাদের উন্নত লজিস্টিক অবকাঠামো এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের (লিডটাইম) ক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্য আরেকটি কারণ হলো- চীনের বর্ধিত মনোযোগ ও প্রতিযোগিতার ধরন। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার ও বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তারা পণ্যের দাম অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। বিপরীতে, ভারত টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) উৎপাদনে জোর দিয়ে নতুন বাজার দখল করছে।
তাছাড়া ভারতের রুপি এবং ভিয়েতনামের ডংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হার অনেক সময় অস্থিতিশীল থাকায় বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মেরুদণ্ড পোশাকখাত ডিসেম্বরে ৩২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার আয় করলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি বড় একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, কাঁচামাল আমদানিতে ডলার সংকট এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিটওয়্যার ও ওভেন খাতের উদ্যোক্তারা মুনাফার সংকটে ভুগছেন।
তথ্য অনুসারে, পাট, চামড়া এবং সাইকেলের মতো খাতগুলোতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও, পোশাক খাতের তুলনায় এগুলোর অবদান অনেক কম। ফলে, পোশাক খাতের ছোট ছোট পতনও সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে গত ছয় মাসে।
চ্যালেঞ্জের পাহাড় থাকলেও বাংলাদেশের জন্য আশার আলো দেখা যাচ্ছে, নতুন কিছু বাজারে। প্রথাগত বাজার (যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য) ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত (২৫.৩৯ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (২১.৩৩ শতাংশ) এবং কানাডায় (৯.১৩ শতাংশ) রপ্তানি বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার রপ্তানি গন্তব্য বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।
২০২৫ সালের শেষ ভাগে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরের সংকট পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। প্রতিযোগী দেশগুলো যারা সরাসরি সমুদ্রপথ বা উন্নত রেল সংযোগ ব্যবহার করতে পারছে, তারা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।













