প্রতীকী ছবি
ব্যাংকে রাখা আপনার কষ্টার্জিত আমানত ঋণের নামে লুট হয়ে গেছে। পুঁজিবাজারে আপনার বিনিয়োগ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারলেও আপনাকে সেই পণ্যই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। চাকরি হারিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়েছেন। মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। অথচ তারা ‘ফ্যাসিস্ট’ হাসিনসার পতনের পর দেশে নতুন বন্দোবস্ত চেয়েছিলেন।
এভাবে সাধারণ জনগণের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সান্ত্বনা খুঁজছে ‘স্থিতিশীলতায়’। ২০২৫ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সরকারি ভাষ্য একটাই- “স্থিতিশীলতা ফিরছে”। প্রবৃদ্ধি আছে, ডলার শান্ত, মূল্যস্ফীতি নামছে, বিপর্যয়ের মধ্যেও ব্যাংকখাত টিকে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্থিতিশীলতা কি বাস্তব, নাকি এটি কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা এক নড়বড়ে ভারসাম্য! কারণ, মাঠের বাস্তবতা বলছে, ভিন্ন কথা।
কাঠামোগত বহু সংস্কারের স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে, তাও শুধু কাগজেকলমেই; বাস্তবে যার কোনো প্রতিফলন নেই। মানুষ স্বস্তিতে নেই, বেকারত্ব ব্যাপক হারে বেড়েছে, ব্যবসার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, ব্যাংক ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে- এসব সংকটের মধ্যেই ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালটি হওয়া উচিত ছিল প্রস্তুতির কিন্তু পুনরুদ্ধারেই মনোযোগ দিতে হয়েছে সরকারকে। সে কারণে বিদায়লগ্নে ২০২৫ সাল চিহ্নিত হতে যাচ্ছে ‘সংকট ঢেকে রাখার বছর’ হিসেবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে- শ্রীলঙ্কা। প্রায় কাছাকাছি সময়েই দেশ দুটিতে সংকট দেখা দেয়। ঋণ করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত লুটপাটে বিপর্যয়ে পড়ে দুটি দেশই। গণআন্দোলনের মুখে উভয় দেশেরই সরকারপ্রধান পালিয়ে যান। সংকটাপন্ন অবস্থায় আইএমএফের কাছ থেকে বেল আউট বা সংস্কারের শর্তে ঋণ সহায়তা নিয়েছে উভয় দেশই।
করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করে ঋণাত্মক জিডিপি থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শ্রীলঙ্কা। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৫.৪ শতাংশে। সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি দাঁড়িয়েছে, ৩.৯৭ শতাংশে, যা চলতি অর্থবছরে ৫ শতাংশের নিচে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির ভয়াবহ সংকটের সময় ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সেখানে এখন মূল্যস্ফীতি মাত্র ২.১ শতাংশে। এর পুরো কৃতিত্বের দাবিদার শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. পি. নন্দনাল বীরাসিংহের।
২০২২ সালের ৭ এপ্রিল নিয়োগ পাওয়া এ গভর্নর শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, সুদের হারও নামিয়ে এনেছেন ৮ শতাংশের নিচে। তখন তিনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সুদহার ১৫.৫ শতাংশে উন্নীত করেছিলেন। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এক বছরে ১১.৩৪ থেকে কমে ৮.২৯ শতাংশে নামলেও সুদহার কমেনি।
প্রবৃদ্ধি: সংখ্যায় আছে, প্রমাণে নেই
৪-৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে সরকার ‘পুনরুদ্ধার’ বলছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসছে- নতুন বিনিয়োগ, নতুন উৎপাদন, নাকি পুরনো গতি টেনে নেওয়া হিসাব থেকে!
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রয়োজনীয় নয়, এমন প্রকল্প থেকে সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইতোমধ্যেই, চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হারও এক দশকের সর্বনিম্নে।
প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম ভূমিকা বেসরকারি খাতের। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই খাতটি স্থবির। বেসরকারি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ০.১ শতাংশ যা করোনার সময়ের (২০১৯-২০ অর্থবছর) চেয়েও কম। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদহারের কারণে চলতি অর্থবছরেও উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন। চালু থাকা অনেক কারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেবাখাতের একটি বড় অংশ এখনও করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদি প্রবৃদ্ধি বাস্তবে হতো, তবে তাহলে তা চাকরির ক্ষেত্রে দেখা যেতো। ব্যবসায়ীদের অপেক্ষায় থাকতে হতো না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি আসলে ‘জিডিপি’ বাঁচানোর প্রবৃদ্ধি, ‘মানুষ’ বাঁচানোর নয়। মূল্যস্ফীতি নামছে, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ কমছে না। খাবার, ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা- সবই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু বাস্তবে মজুরি কমেছে। ২০২৫ আসলে সংকট ‘সহনশীলতা’র পরীক্ষা।
সম্প্রতি, এক গোলটেবিল আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনীতিতে এটি আরেকটি ধাক্কা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক, প্রাকৃতিক বা বাহ্যিক- যেকোনো ধরনের অস্থিরতারই নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।’
ব্যাংকখাত: দুর্দশায় দায় কার
‘২০২৫ সালে ব্যাংকখাতে অস্থিরতা কাটতে শুরু করেছে এবং খাতটি স্থিতিশীল হওয়ার পথে রয়েছে’ বলে দাবি করেছেন গভর্ণর আহসান এইচ মনসুর ও অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বার বার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হারে পুরো এশিয়ার শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। মন্দঋণের বিপরীতে ২৪টি ব্যাংক এখন নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতিতে পড়েছে, যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকিংখাতের জন্য একটি অশনি সংকেত। কারণ, এটি ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যা মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণেরই ফল।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ঋণের নামে ‘আমানত’ লুটের কারণে ব্যাংকগুলো এমন দুর্দশায় পড়েছে। সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহযোগিতার মাধ্যমে লুটের এমন সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক ব্যাংক এখন আমানতকারীদের টাকাই ফেরত দিতে পারছে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পালাবদলের পর হাসিনা ঘনিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ীর ব্যবসা সীমিত কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে, উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে কিছু ব্যাংক টিকে আছে, কিন্তু ব্যবসা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদনের বিপরীতে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন জমা পড়েছে। এই বিশাল অংকের আবেদনের সিংহভাগই এসেছে ২০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে, যারা সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করেছে।
এদিকে, ব্যবসায়ীদের আবেদনে সাড়া দিয়ে মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডও রাখা হয়েছে। এমন সুবিধা হাসিনার আমলেও বছর বছর দেওয়া হয়েছিল। এতে করে ঋণ ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে এবং সংকটকে ভবিষ্যতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
শান্ত ডলার বাজার
২০২৫ সালে ডলার আর লাফাচ্ছে না। কিন্তু এটি বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নয়, এটি ব্যবস্থাপনার ফল। ডলারের চাহিদা কমলেও বিনিময় হার কমতে দেওয়া হচ্ছে না প্রবাসী আয় ও রপ্তানির দোহাই দিয়ে। বরং ডলারের দাম যাতে পড়ে না যায়, সেজন্য গত ৬ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৩০০ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডলার স্থির রাখতে গিয়ে অর্থনীতির গতি কমানো হয়েছে। উৎপাদনখাতকে বলি দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি ঋণ নিয়েছিল, সেগুলোকে এখন লোকসান দিতে হচ্ছে। সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বেড়ে গেছে ডলারের দাম ধরে রাখায়। ডলারের কারণে আমদানি করা পণ্যের দামও কমছে না। ফলে, মূল্যস্ফীতি সহজেই নামছে না।
ভবিষ্যত বিক্রি করে চলা
রাজস্ব আদায়ে কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দু’ভাগ করা হয়েছে। তবে সুফল এখনো মেলেনি। রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি থাকলেও কর জিডিপির অনুপাত এখনও লজ্জাজনকভাবে কম। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ধার করছে, দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে।
সম্প্রতি, উপদেষ্টা পরিষদে সংশোধিত বাজেট অনুমোদনের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে। এই প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।’
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, রাজস্বের বড় অংশ চলে যাচ্ছে, শুধু সুদের টাকা দিতে। উন্নয়নের আড়ালে লুটপাটের উদ্দেশ্যে নেওয়া মেগা প্রকল্প ও অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণ ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি থেকে ২১ লাখ ৫২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী আমলে নেওয়া এই বিপুল ঋণই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্বাভাবিক ব্যয়ের মেগা প্রকল্পগুলো থেকে কম আয় হওয়ায় এখন ঋণ নিয়েই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সরকারের ঋণ বাংলাদেশকে এমন দুরবস্থার মধ্যে ফেলেছে যে, এখন দেশের রাজস্ব আয়ের প্রায় ২২ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর ঋণ আরও ব্যয়বহুল হবে।
বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে ব্যর্থতা
২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না-পারা। তরুণদের জন্য নতুন কোনো কাজ নেই। এসএমইখাত উচ্চ সুদে শ্বাস নিতে পারছে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা নতুন প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কাগজে আছে, মাঠে নেই। দেশি বিনিয়োগকারীরা পট পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অর্থনীতি তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন সবাই অপেক্ষা করতে থাকেন!
ফাহমিদা খাতুন বলেন, “স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বাড়তে থাকা বৈষম্যের সমাধান না হলে বাংলাদেশ একটি ‘নিম্নমাত্রার অর্থনৈতিক সমতায়’ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
তিনি বলেন, ‘ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করে ফেলছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৩-২৪ শতাংশে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ২২.৫ শতাংশে নেমেছে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম বিনিয়োগ হার হওয়া উচিত জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে তা ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি নিতে হবে।’
ফাহমিদা খাতুন শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য তুলে ধরে কর্মসংস্থানের উদ্বেগজনক সংকোচনের কথা বলেন। জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মসংস্থান কমেছে, ১৭ লাখ ৪০ হাজার, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশই হলেন নারী।
তিনি বলেন, ‘এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।’ ‘বৈষম্য কমাতে মানসম্মত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান অপরিহার্য’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য: বাস্তবতা
সরকারি হিসেবে দারিদ্র্য কমছে। কিন্তু বাজার, গ্রাম, শহরের বস্তি- সব জায়গায় নতুন দরিদ্র দেখা যাচ্ছে। টানা চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় প্রকৃত আয় কমে সমস্যয় পড়েছে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ। বাজারে পণ্যের বাড়তি দাম খেয়ে ফেলছে বাড়তি আয়ের টাকা। দীর্ঘদিনের এমন পরিস্থিতির কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।
সম্প্রতি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়েছে, তিন বছরের ব্যবধানে দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশে।
গত ২৫ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ- অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যেকোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়লে আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি দুই অংক থেকে কমে ৮.২৯ শতাংশে নেমে এলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি প্রায় স্থবির থাকায়, প্রকৃত আয় ও ক্রয় সক্ষমতা কমে যাচ্ছে মানুষের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উভয়ই বেড়েছে।
পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা
কার্যকর সংস্কার ও আস্থাহীনতার অভাবে ২০২৫ সালে পুঁজিবাজার শুধু পিছিয়েছে। এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক হারিয়েছে ৯.৩২ শতাংশ বা ৩৫১ পয়েন্ট। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম চার কার্যদিবসেই সূচক বেড়েছিল ১৫ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শেয়ারবাজারের লেনদেন শুরু হয়েছিল দর পতনে। লেনদেন হয়েছিল মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা। বছর শেষ হলেও লেনদেন এখনো সেই ৩শ কোটির ঘরেই রয়ে গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে যে কমিশন এসেছে, তারা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সংস্কার দেখাতে পারেননি। গত প্রায় দেড় বছরে কোনো আইপিও আসেনি।
গত ১১ মে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, যেসব বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে। এরপর ৬ মাসেরও বেশি সময় পার হয়েছে কিন্তু এসব কোম্পানির আইপিও আসার কোনো আওয়াজও নেই। বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে ৩ মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি।
বাজারের গভীরতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ না-নিয়ে শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল রাশেদ মাকসুদ কমিশনের কার্যক্রম। এতে করে যেটা হয়েছে, বড় বিনিয়োগকারীরা প্রায় সবাই সাইড লাইনে ফিরে গেছেন। ফলে ক্রেতা সংকটে পুরো বছরে কখনও থেমে থেমে এবং কখনও লাগাতার দর পতন ঘটেছে। শেয়ারে লগ্নি করে মুনাফা নয়, পুঁজি হারিয়েছেন অধিকাংশ মানুষই। বছরের শুরুর দিকের তুলনায় শেষের দিকে এসে দর পতনের মাত্রা বেড়েছে।
আইনি সংস্কারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি বর্তমান বিএসইসি’র নেতৃত্ব দিয়েছিল, তার অনেকাংশই পূরণ হয়নি। সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আস্থার সংকট দেখা গেছে। বছরের উল্লেখযোগ্য সময় ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেছেন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ।
দেখা গেছে, মার্জিন ঋণ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং আইপিও বিষয়ে ৩টি বিধিমালার সংশোধনকে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার’ ধরে নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমান কমিশন। এ নিয়ে চরম হতাশা রয়েছে, বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এর নেতিবাচক প্রভাবও শেয়ারবাজারে আছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা ছিল বছরের শেষ দিকের খারাপ খবর। এরই মধ্যে আরও ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের ঘোষণায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের।
সুখবর শুধু প্রবাসী আয়ে
অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে স্বস্তি দিয়েছে, শুধু রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। ডিসেম্বরের ২৯ দিনেই এসেছে ৩০৪ কোটি ডলার, যা দেশের প্রবাসী আয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭.৭ শতাংশ বেশি।
বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় প্রবাসী আয়ে এমন ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরো শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
রপ্তানি আয়ে ধীরগতি
টানা ৪ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমলেও বার্ষিক হিসাবে এখনো সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে রপ্তানিখাত। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে বড় প্রবৃদ্ধি হলেও পরবর্তী ৪ মাস টানা কমতে দেখা যাচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ০.৬ শতাংশ বেশি।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে শিল্পটি। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারেও শুল্ক দিয়ে পোশাক রপ্তানি করতে হবে বাংলাদেশকে, যদি-না এর আগে জিএসপি প্লাস চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়। সেক্ষেত্রে আগামীতে রপ্তানি আয়ের প্রধানখাত নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতে যাচ্ছে।
বড় সংকট আস্থার
২০২৫ সালে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা ডলার নয়, মূল্যস্ফীতি নয়, ‘আস্থা’। ব্যবসা আস্থা পাচ্ছে না। ভোক্তা ভরসা পাচ্ছেন না। ব্যাংক ঝুঁকি নিতে চান না। যে অর্থনীতিতে আস্থা নেই, সেখানে সংখ্যার স্থিতি বেশিদিন টেকে না। এটি সেই বছর, যখন বাংলাদেশ হয়ত আবারও সুযোগ হারাতে চলেছে। ২০২৫ তাই পুনরুদ্ধারের বছর নয়, এটি ছিল ‘সংস্কার এড়িয়ে সংকট ঢেকে’ রাখার বছর। এই সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য দিতে হবে সামনে।
এমন পরিস্থিতিতে পুরো জাতি এখন অপেক্ষা করছে, সেই রাজনীতিবিদদের জন্য, যারা দুই বছর আগেও অবিশ্বাসীর তালিকায় ছিলেন। সবাই তাকিয়ে আছেন নির্বাচনের দিকে, যেন নির্বাচিত সরকার এলেই সব সমস্যার, সব জটিলতার অবসান হবে।













