উন্মোচন

খালেদা জিয়া: যে ভারতবিরোধী নেত্রীর প্রয়াণ অগ্রাহ্য করতে পারেনি দিল্লি

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

ডিএসজে কোলাজ

প্রবল ভারতবিরোধী ভাবমূর্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি দেশটির ক্ষমতাসীন দল বা সেখানকার সংবাদমাধ্যমগুলো। বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকায় উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।

ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলা শোকবার্তায় নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, “বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

“২০১৫ সালে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আমার সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাতের কথা স্মরণ করছি। আমরা আশা করি, তাঁর ভাবনা ও উত্তরাধিকার আমাদের অংশীদারত্বকে ভবিষ্যতেও পথনির্দেশ করবে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি,” যোগ করেন তিনি। পরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম ছিল— ‘বিহাইন্ড খালেদা জিয়া অ্যান্ড হার “অ্যান্টি–ইন্ডিয়া” ট্যাগ, দ্য নট–সো–টোল্ড স্টোরি অব নুয়ান্স ইন টাইস উইথ বাংলাদেশ’ (“খালেদা জিয়া এবং তাঁর ‘ভারতবিরোধী’ তকমা: বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নেপথ্যের এক অজানা সূক্ষ্ম সমীকরণের গল্প”)।

দ্য টেলিগ্রাফ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, নেতাদের অনুরোধে ১৯৮১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ধারণার পরিপন্থী বিভাজনের রাজনীতিতে সায় দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে টিকে ছিলেন।

তাঁর সমালোচকেরা প্রায়ই তাঁর শাসনশৈলী নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, বিশেষ করে তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানকে নিয়ে—যিনি ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার মামলার আসামি এবং যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সমান্তরাল কাঠামো চালানোর অভিযোগ ছিল।

পাকিস্তানের প্রতি নমনীয়তা, চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং জনসভায় ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্যের কারণে তিনি ‘ভারতবিরোধী’ তকমা পান। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাঁর সখ্যতা এই তকমাকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করেছিল। তবে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই তকমা দেওয়া ছিল ‘অন্যায় ও দুর্ভাগ্যজনক’, কারণ ভারতের নীতিনির্ধারকরাও হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁদের পক্ষপাত কখনো গোপন করেননি।

দ্য টেলিগ্রাফ আরও লিখেছে, খালেদা জিয়া তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে প্রায়ই বলতেন যে, তিনি এই তকমা পাওয়ার যোগ্য নন, কারণ তিনি প্রতিবেশী বড় দেশটির সঙ্গে একটি ‘উষ্ণ অথচ সমমর্যাদাপূর্ণ’ সম্পর্ক চেয়েছিলেন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন, ২০০৭ সালে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি যখন ঢাকা সফরে আসেন, তখন খালেদা জিয়া তাঁর জন্য বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী পাটিসাপটা ও পিঠা পাঠিয়েছিলেন।

‘বাংলাদেশ: অবশেষে দুই বেগমের লড়াইয়ের অবসান’—এমনই শিরোনাম ছিল সর্বভারতীয় আরেক ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান-এর। খবরে বলা হয়, “বাংলাদেশের ‘লড়াইরত দুই বেগম’-এর পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটেছে। এটিকে একটি ‘ড্র’ বা অমীমাংসিত লড়াই হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে; কারণ দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (৮০) আজ সকালে জীবনের যুদ্ধে হেরে গেছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় শাসন করা শেখ হাসিনা গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।”

পত্রিকাটি আরও লিখেছে, “তবে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ থাকলেও, জিয়ার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের সময়ে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, জিয়া পরিবার ‘সহমর্মিতার ফ্যাক্টর’-এর কারণে বাড়তি সুবিধা পেতে পারত।”

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক বিক্রিত পত্রিকা দৈনিক আনন্দবাজার শিরোনাম করেছে— একদা রাজনীতিতে ঘোর অনিচ্ছুক ‘ফার্স্ট লেডি’ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী! জলপাইগুড়ির ‘পুতুল’ হয়ে উঠেছিলেন ‘বেগম জিয়া’

খবরের একাংশে বলা হয়, “শেষ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা ও হাসিনাকে কেন্দ্র করেই। রাজনীতির আঙিনা ছাপিয়ে তাঁদের দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যক্তিগত পরিসরেও ঢুকে পড়েছিল। যেমন, আলোচনায় এসেছে তাঁদের যোগাযোগের মাধ্যম লাল টেলিফোন। দুই নেত্রীর ফোনকথোপকথনের একাংশ একবার প্রকাশ্যে চলে আসে… কিন্তু সেই টেলিফোনের রিসিভার ধরার হাতটি চিরতরে ছুটি নিল জগৎ থেকে।”

পশ্চিমবঙ্গের আরেক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘আজকাল’ খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে যে শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে, তা হলো— ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ধরণ আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন খালেদা, তাঁর সঙ্গে হাসিনার দ্বন্দ্ব পরিচিত ছিল গোটা বিশ্বে।’

খবরে বলা হয়, ‘দীর্ঘ রোগভোগের পর বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৮০ বছর বয়সে জীবনাবসান হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সভাপতি এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দুই মহিলা রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম। গত চার দশক ধরে দু’জনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিলেন। পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই পলাতক। কিন্তু খালেদার পদ্মাপারের মসনদে প্রত্যাবর্তন আর হলো না।’

পশ্চিমবঙ্গের আরেক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বর্তমান’ লিখেছে— ‘হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, খালেদার প্রয়াণে রাজনৈতিক শূন্যতা বাংলাদেশে।’

খবরে বলা হয়, ‘…শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রয়াত।’

সংবাদটির আরেক অংশে বলা হয়, ‘…মাথায় ঘোমটা, চোখে চওড়া রোদচশমা—এই দুটি বিষয় ছিল খালেদার পরিচয়ের অংশ। তবে স্বামীর ছত্রচ্ছায়ায় নয়, নিজের পরিচিতি তিনি আলাদাভাবে তৈরি করেন। হন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী।’

বর্তমান উল্লেখ করে, খালেদার জন্ম ১৯৪৫ সালে, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে। পিতা ইসকন্দর আলী মজুমদারের চায়ের ব্যবসা ছিল। ব্যবসার কথা চিন্তা করেই দেশভাগের সময়ে সপরিবারে দিনাজপুর শহরে (বর্তমান বাংলাদেশে) চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) আদি বাড়ি ছিল খালেদাদের।

১৯৬০ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। তাঁর আসল নাম খালেদা খানম পুতুল। বিয়ের পর স্বামীর নাম ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি। পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ। ১৯৭৭ সালে সেই দেশের প্রেসিডেন্ট হন খালেদার স্বামী জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালে তিনি তৈরি করেন বিএনপি বা বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি। ১৯৮১ সালে নিজেরই দেশের সেনা কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত হন জিয়াউর রহমান।

১৯৮২ সালে স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করেন খালেদা। ১৯৮৩ সালে দলের সহসভাপতি হন। ১৯৮৪ সালে পৌঁছান বিএনপির শীর্ষ পদে। পরে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে পদ্মাপাড়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। দু’দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০১২ সালে শেষবার ভারতে এসেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া। ওই সফরে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। দেখা করেন বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গেও। দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন খালেদা।

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় দৈনিক ‘সংবাদ প্রতিদিন’ ‘রোগের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষ, প্রয়াত বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে লিখেছে, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। ১৯৯১–১৯৯৬ সাল এবং ২০০১–২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে ছিলেন জিয়াপত্নী।

পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এবং খালেদা জিয়া নিজেও প্রবল রাজনৈতিক চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ক্রমশ শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। পরে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপি কিছুটা অক্সিজেন পায়। খালেদার নেতৃত্বে ফের ঘুরে দাঁড়াতে কোমর বাঁধে। কিন্তু অশীতিপর খালেদার পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না। ধীরে ধীরে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে একেবারে কাবু করে ফেলে। অবশেষে পদ্মাপাড়ের রাজনীতির আকাশ থেকে খসে পড়ে এক তারা।

খালেদা জিয়ার ভারতবিরোধী অবস্থান

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে তিনি ভারতের নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সমালোচনামূলক বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর এসব বক্তব্যের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশের ‘সার্বভৌমত্ব’ ও ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষা।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, তারা প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।’

২০১৭ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর তিনি একে ‘ব্যর্থ সফর’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ভারতকে সব দিয়ে এসেছেন, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই আনতে পারেননি।’

২০১৭ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক সইয়ের তীব্র প্রতিবাদ জানান খালেদা জিয়া। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—যেখানে বাংলাদেশ নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে, সেখানে কেন ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে হবে বা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

দীর্ঘ সময় ধরে ভারতকে করিডোর বা ট্রানজিট দেওয়ার বিরোধিতা করেন খালেদা জিয়া। এ বিষয়ে একাধিক জনসভায় তিনি ভারতের ট্রাক বা যানবাহনকে বিনা মাশুলে বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহারের অনুমতিকে ‘দাসত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর দাবি ছিল, ট্রানজিট সুবিধা দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে এবং সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে।

১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী চুক্তি’র কট্টর সমালোচক ছিলেন খালেদা জিয়া। ১৯৯০-এর দশকে বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি এই চুক্তিকে ‘গোলামির চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। ১৯৯৬ সালে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে এই ‘শৃঙ্খল’ থেকে দেশকে মুক্ত করবেন।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ড এবং গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুতেও তিনি প্রায়ই কড়া ভাষায় ভারতকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভারত বন্ধুত্বের কথা বললেও সীমান্তে বাংলাদেশিদের ‘পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে’, যা কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হতে পারে না। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়াকে তিনি ভারতের ‘একতরফা দাদাগিরি’ বলে সমালোচনা করেন।

খালেদা জিয়া প্রায়ই অভিযোগ করতেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটে নয়, বরং ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে আছে। সামগ্রিকভাবে, তাঁর ভারতসংক্রান্ত বক্তব্যের মূল সুর ছিল ‘অসম চুক্তির বিরোধিতা’ এবং ‘আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের প্রতিরোধ।’

তাঁর সমর্থকদের কাছে এই অবস্থান ছিল ‘দেশপ্রেমের পরিচয়’, আর সমালোচকদের চোখে এটি ছিল ‘ভারতবিদ্বেষী রাজনীতি।’

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top