অর্থনীতি পুনর্গঠনে তারেক রহমানের কী ‘প্ল্যান’

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

ছবি: ডিএসজে কোলাজ

কী সেই ‘প্ল্যান? দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে কী ভাবছেন তিনি? শিল্পখাত, কর্মসংস্থান বা কৃষির মতো বিষয়গুলো নিয়েই-বা কী পরিকল্পনা তাঁর?

প্রায় ১৮ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করেছে ডিএসজে প্রতিবেদক, যা সবিস্তারে রয়েছে তাঁর দলের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পাশাপাশি দলের শীর্ষ নেতারা বারবার উল্লেখ করেছেন বিষয়টি।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখেছেন, “তাঁর নির্দেশিত ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’ আজ সারাদেশে এক গণসনদে পরিণত হয়েছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, “এই রূপকল্প কেবল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারই নয় বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা।”

চলতি বছরের ১৫ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও কুমিল্লা-৬ আসনে দলটির মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, “বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফাই রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের সর্বজনীন দিক-নির্দেশনা।”

সারাদেশের নেতাকর্মীদের ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা ও জনসম্পৃক্ততা’ শীর্ষক কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জনপদে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই নির্দেশনা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিএনপি।

বছরের শুরুতেই (২৮ জানুয়ারি) খুলনা জেলা ও মহানগর এবং সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য আয়োজিত এমন এক কর্মশালায় যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে তারেক রহমান আগামী নির্বাচনের আগেই বিএনপির ৩১ দফা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

এই দফাগুলো প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ভাষ্য, “শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং বিএনপির জনসম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথমে প্রদত্ত ২৭ দফার ওপর ভিত্তি করে, যা পরবর্তীতে যুগপৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শরিক সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে ৩১ দফায় পরিণত হয়।”

“অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপির নজর পুনর্গঠনে” শিরোনামে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছিল, ‘দেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপি’।

দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটলে অর্থনৈতিক স্থবিরতাও কেটে যাবে। তবে এক্ষেত্রে শুধু সরকারের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক রূপরেখা ও রাজনৈতিক চেতনা দরকার বলেও বলছেন তারা। তাদের বিশ্বাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠন সম্ভব হবে।

দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ট্রিলিয়ন-ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলারও ঘোষণা দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকার পূর্বাচলে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তব্যের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, “আজ বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি! এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সহযোগিতা লাগবে।”

“এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়, প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ উপস্থিত আছেন, সব মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে,” যোগ করেন তিনি।

একদিন পর (২৭ ডিসেম্বর) রাতে তারেক রহমান নিজের ভেরিফাইয়েড ফেসবুক পেজে বলেন, “আমি শুধু কোনো স্বপ্নের কথা বলিনি, আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলেছি, যে বাংলাদেশে শান্তি ও মর্যাদা থাকবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করবে আর প্রতিটি শিশু আশার আলো নিয়ে বড় হবে।”

“এই পরিকল্পনা সব বাংলাদেশিদের জন্য। একটি ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের জন্য। সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার মতো বাংলাদেশের জন্য,” উল্লেখ করেন তারেক রহমান। প্রায় আড়াই বছর আগে প্রথমবারের তাঁর পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণকে জানানো হয়।

সেদিন বিএনপির পক্ষ থেকে ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখা প্রকাশ করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; যা দলটির ওয়েবসাইটে লিপিবদ্ধ আছে।

মহাসচিব বলেছিলেন “এই ৩১ দফা দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, সিদ্ধান্ত এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির ফলাফল, যেখানে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল দিক-নির্দেশক এবং প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে।

প্রসঙ্গত, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা ১৯ দফা কর্মসূচি প্রথমবার ঘোষণা করেছিলেন ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকার একটি প্রেস কনফারেন্সে দলটির ২০১৭ সালের ১০ মে  ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকাশ করেছিলেন। তারেক রহমানের নির্দেশনায় ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের রূপরেখা প্রকাশ করা হয়।

প্রস্তাবে অর্থনীতিবিষয়ক দফার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে, “অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, কর্পোরেট নেতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি সমন্বয়ে একটি “অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন”গঠন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিরিখে প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বণ্টনের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা হইবে। উপরোক্ত সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, জুডিশিয়াল কমিশন, মিডিয়া কমিশন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশনগুলি সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্ব স্ব প্রতিবেদন দাখিল করিবে, যেন সংশ্লিষ্ট সুপারিশসমূহু দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।”

মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় শ্রমের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত দফায় বলা হয়েছে, “মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। শিশুশ্রম বন্ধ করে তাদের জীবন বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা হবে। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ সকল বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন, মর্যাদা ও কর্মের নিরাপত্তা এবং দেশে বিমানবন্দরসহ সকল ক্ষেত্রে হয়রানিমুক্ত সেবা প্রাপ্তি ও ভোটাধিকার নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা হবে। চা-বাগান, বস্তি, চরাঞ্চল, হাওড়-বাওড় ও মঙ্গাপীড়িত ও উপকূলীয় অঞ্চলের বৈষম্য দূরীকরণ ও সুষম উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।”

আরেকটি দফায় বলা হয়েছে, “বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা হইবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ রোধ করিবার লক্ষ্যে জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি হইতে বিদ্যুৎ ক্রয়ে চলমান সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করা হইবে। আমদানিনির্ভরতা পরিহার করিয়া নবায়নযোগ্য ও মিশ্র এনার্জি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।”

“শিল্পখাতের বিকাশে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করিয়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হ‌ইবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহ, সুযোগ ও প্রণোদনা দেওয়া হইবে। পরিকল্পিতভাবে দেশব্যাপী সমন্বিত শিল্প অবকাঠামো গড়িয়া তোলা হইবে,” বলেও উল্লেখ রয়েছে।

আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নবিষয়ক দফায় বলা হয়েছে, “যুব সমাজের ভিশন, চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করিয়া আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হইবে। এক বছরব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত, যেটাই আগে হবে, শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা প্রদান করা হবে। বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে নানামুখী বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।”

এছাড়া “যুব সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” আদায়ের লক্ষ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হবে” বলেও লেখা রয়েছে।  আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনা করবে বিএনপি।

কৃষকের উৎপাদন ও বিপণন সুরক্ষা প্রসঙ্গে ৩১ দফার মধ্যে বলা হয়েছে, “কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। পর্যায়ক্রমে সকল ইউনিয়নে কৃষিপণ্যের জন্য সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়া হইলেও শস্যবীমা, পশুবীমা, মৎস্যবীমা এবং পোল্ট্রিবীমা চালু করা হবে। কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হবে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন এবং গবেষণার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এতদসংশ্লিষ্ট রফতানিমুখী কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পখাতকে প্রণোদনা দেওয়া হবে।”

“দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সড়ক, রেল ও নৌপথের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে সারাদেশে সমন্বিত বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা হবে। দেশের সমুদ্র বন্দর ও নৌবন্দরসমূহের আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হবে,” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে আরেকটি দফাতে।

অন্য একটি দফাতে বলা হয়েছে, “একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে শহরে ও গ্রামে কৃষি জমি নষ্ট না করিয়া এবং নগরে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করিয়া পরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়নের নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করা হবে।”

দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছেন, “এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য। ৫ কোটির মতন শিশু। ৪০ লাখের মতন প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন। কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। এই মানুষগুলোর একটি প্রত্যাশা আছে, এই রাষ্ট্রের কাছে। এই মানুষগুলোর একটি আকাঙ্ক্ষা আছে, এই দেশের কাছে। আজ আমরা সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ হই, আজ আমরা যদি সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লক্ষ কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি, ইনশাল্লাহ।”

“আজ আমাদের সময় এসেছে সকলে মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে। এই দেশে একইভাবে সমতলেরও মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই, সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো আমরা, যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন। অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই,” যোগ করেন তিনি।

বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলছেন এবং লিখেছেন তারেক রহমান। তিনি ৩০ অক্টোবর ফেসবুকে লিখেছেন, “২০৩৪ সালের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ট্রিলিয়ন-ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে, যা লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে; যেখানে প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে নারী, গর্বের সঙ্গে দেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উল্লেখ করে তারেক রহমান লিখেছিলেন, “২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম: মোট পুরুষদের ৮০ শতাংশের বিপরীতে মোট নারীদের মাত্র ৪৩ শতাংশ কর্মজীবী। এই ব্যবধান আমাদের সতর্ক করছে যে, আমরা আমাদের জাতির অর্ধেকেরও বেশি মেধা ও দক্ষতাকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি।”

তারেক উল্লেখ করেন, বিএনপি এমন যেকোনো পশ্চাৎমুখী ধারণা প্রত্যাখ্যান করে, যা নারীর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে। ওই মাসের শুরুতে (৭ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শ্রমবাজার থেকে বের হয়ে যাওয়া নারীদের কর্মসংস্থান সংকটে পড়ার উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল।

বাংলাদেশে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ হারানো ৩০ লাখের ২৪ লাখই নারী উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তারা আরো জানায়, শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ৬০.৯ থেকে ৫৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। আর এইসময়ে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। শ্রমবাজারের এই সংকোচনে নারীরাই সবচেয়ে আক্রান্ত হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৫ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২০.৫ শতাংশ অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য বেড়েছে প্রায় ০.৭ শতাংশ পয়েন্ট।

এই প্রেক্ষাপটে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে (২৯ নভেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে বর্তমান সরকারের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “যেসব মালিক লুটপাট করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনুন; কিন্তু কারখানা বন্ধ করে লাখো মানুষের জীবিকা বন্ধ করবেন কেন?”

তিনি “কর্মসংস্থান ধ্বংস করে কোনো রাষ্ট্র এগোতে পারে না,” উল্লেখ করে বলেন, “কারখানাগুলো চালু রাখতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।”

বিএনপি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে ফখরুল দাবি করেন, তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন অর্থনীতি সচল ছিল এবং বাংলাদেশকে ‘উদীয়মান টাইগার’ বলা হতো।

এর আগে ২৩ অক্টোবর একটি অনুষ্ঠানে ফখরুল দাবি করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অর্থনীতি পুনর্গঠন সম্ভব হবে। বর্ষীয়ান এই নেতা ২০ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “গত ১৫ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ,’ তারা দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করেছে। এখন বিএনপি সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে দেশ পুনর্গঠন করতে চায়।”

সর্বশেষ, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়ার বিএনপিতে যোগদানকে স্বাগত জানিয়ে ১ ডিসেম্বর বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আগামী নির্বাচনে জনগণ সমর্থন করলে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবে বিএনপি। কারণ, বিএনপির সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে।”

বাসসে প্রকাশিত ২৪ ডিসেম্বরের লেখাটিতে তিনি বলেছেন, “নির্বাচনপরবর্তী সময়ে সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনায় তারেক রহমানের মেধা, দূরদর্শিতা এবং আধুনিক চিন্তাধারা এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলেই আজ সর্বস্তরের মানুষ গভীরভাবে বিশ্বাস করে। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাসজীবনে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন কাছ থেকে দেখেছেন, যা তাকে একজন বিশ্বমানের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছে। দেশের মানুষ আজ মনে করে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই সমৃদ্ধ হবে না বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের মাঠে লড়াই থেকে শুরু করে রাষ্ট্রসংস্কারের প্রতিটি ধাপে তার উপস্থিতি আজ অপরিহার্য।”

ঢাকার দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের তরুণদের সবচেয়ে বড় চাহিদা কর্মসংস্থান। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগই পারে টেকসই চাকরির সুযোগ তৈরি করতে। ঋণনির্ভর বা নোট ছাপানো অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে।”

তিনি জানান, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি মূলনীতি অনুসরণ করবে বিএনপি সরকার। বিনিয়োগ হবে ভ্যালু ফর মানি অর্থাৎ বিনিয়োগের তুলনায় যথাযথ মুনাফা নিশ্চিত, বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা নিশ্চিত ও পরিবেশ সংরক্ষণ। দেশের অর্থনীতি উন্নয়নশীল ও টেকসই করতে এ চারটি নীতি পালন অপরিহার্য।

ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উন্নয়ন, দক্ষতা বাড়ানো, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন মার্কেটিং সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন আমীর খসরু মাহমুদ।

এছাড়া প্রতিটি জেলায় স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপন এবং পুঁজিবাজারকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আনার ওপরও গুরুত্ব দেন বিএনপির এই নেতা।

গত জুলাই মাসেই এক অনুষ্ঠানে খসরু বলেছিলেন, “তারেক রহমান মুক্ত অর্থনীতির কথা ভাবছেন। অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ করার কথা ভাবছেন। অর্থনীতিতে কোনো দখলদারত্ব চলবে না। অর্থনীতিকে মুক্ত রাখতে হবে, যাতে করে সব মানুষ সুযোগ নিতে পারে।” অর্থাৎ, বিএনপির পরিকল্পনা ও নীতি এমন হবে, যাতে কোনো একাধিপত্য বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চক্র গড়ে না ওঠে। বিএনপির এই নেতার ভাষ্য ছিল, তারেক রহমানের আগামী দিনের ভিশন হচ্ছে- ক্রিয়েটিভ ও ইকোনোমিক।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের এবং চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও ঢাকার পানগাঁও নৌটার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া নিয়ে আলোচনা–সমালোচনার মধ্যে ২৫ নভেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, “একটি দেশ যেই সরকারকে নির্বাচিত করেনি, সেই সরকার দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দিতে পারে না।”

দেশের জনগণের ওপর এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অথচ এমন একটি সরকার এসব কৌশলগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যাদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই।”

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইংরেজিতে লেখা দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেছেন, “বিএনপি আগেও বলেছে, সময় নেওয়ার বিকল্পের পথে না গিয়ে ২০২৬ সালে উত্তরণের সময়সূচি এগিয়ে নেওয়া পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অথচ তা নিচ্ছে এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট নেই। তারপরও তারা এমন দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে বহু দশক ধরে প্রভাবিত করবে।”

“অ্যাঙ্গোলা ও সামোয়ার মতো দেশগুলোর জন্য উত্তরণের সময়সীমা পরিবর্তন করা হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মও বলছে- কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে ধাক্কা খেলে সময়সীমা নিয়ে নমনীয়তা দেখানো যায়। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যত গঠনে বাড়তি সময় চাওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত,” যোগ করেন তিনি।

তারেক রহমানের ভাষ্য, “সরকারি নথিপত্রে বলা হয়েছে, দেশের ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে ব্যাংকিংখাতে চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা, ঋণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, রপ্তানি শ্লথ হয়ে আসার চাপ মোকাবিলা করছেন। এটা উত্তরণবিরোধী কোনো যুক্তি নয়। বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু উত্তরণে ‘যোগ্য’ হওয়া আর ‘প্রস্তুত’ হওয়া এক জিনিস নয়।”

“এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়ে আমরা যেমনটা দেখেছি চট্টগ্রাম বন্দরের বিষয়েও তা-ই দেখছি। সব কৌশলগত বিকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের সমালোচনাকে ভালোভাবে নেওয়া হচ্ছে না।

দ্রুততা ও অনিবার্যতার অজুহাত দেখিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে,” যোগ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই সন্তান।

চলতি বছরের শুরু থেকেই বিএনপি বলে আসছে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসন ব্যবস্থার কারণে “নিরাপত্তাহীনতা, উন্নয়ন ব্যাহত, জনগণের ভোগান্তি” চলছে। তাই, একটি “নতুন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির বাংলাদেশ” গড়ার জন্য নির্বাচন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন জরুরি বলে (৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দফতর সম্পাদক ও মুখপাত্র হিসেবে সক্রিয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top