জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোনো ধরনের ভাঙনের শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, “সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে এবং ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট—উভয় ক্ষেত্রেই শক্ত অবস্থান বজায় আছে।”
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, “অতীতে নির্বাচনকে ঘিরে অর্থনীতিতে অস্থিরতার যে আশঙ্কা দেখা দিতো, এবার তার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। বাস্তব সূচক ও তথ্য অনুযায়ী অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, গত বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। চলতি বছরেও ইতোমধ্যে দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য- বছর শেষে রিজার্ভ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
গভর্নর বলেন, “ডলার বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। স্বচ্ছ অকশন পদ্ধতিতে বাজার স্থিতিশীল রেখে ডলার কেনা হচ্ছে।” রিজার্ভ বাড়াতে আইএমএফের অর্থের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ
ব্যাংকিংখাতে খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, “এই বাস্তবতা আর গোপন করা হবে না। প্রকৃত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ব্যাংকিংখাতে আস্থা ফেরানোই এখন লক্ষ্য।”
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিংখাতের তিনটি প্রধান সমস্যা হলো—গভর্নেন্সের ঘাটতি, বড় অঙ্কের মূলধন সংকট এবং অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ।
গভর্নর বলেন, “ব্যাংকিংখাতে অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বড় ঋণ তৃতীয় পক্ষ দিয়ে যাচাই করা হবে এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ও ফরেনসিক অডিট জোরদার করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে।
একীভূত ব্যাংকগুলোর শাখা পুনর্বিন্যাস
ব্যাংকিংখাত সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান গভর্নর। খুব শিগগিরই এসব ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড পরিবর্তন করা হবে এবং শাখা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে কার্যক্রমও শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, “একই এলাকায় একাধিক শাখা থাকলে সেখানে একটি শাখা রাখা হবে এবং বাকি শাখাগুলো অন্যখানে স্থানান্তর করা হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ডিপোজিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।”
প্রসঙ্গ: নয় এনবিএফআই লিকুইডেশন
নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) প্রসঙ্গে গভর্নর জানান, নয়টি এনবিএফআই একীভূত করা হবে না বরং লিকুইডেশনের পথে যাওয়া হবে। প্রয়োজনে শেয়ার মূলধন শূন্য করে হলেও আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, “আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য।”













