শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। দুর্নীতি ও ঢালাও লুটপাটের কারণে মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর আর্থিক দৈন্যতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
মন্দ ঋণের ক্ষতি সামলানোর জন্য নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের যে বিধান রয়েছে, ২৪টি ব্যাংক তা পরিপালন করতে পারছে না। মোদ্দা কথা, ক্ষতি সামলানোর সামর্থ্যই নেই এসব ব্যাংকের।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকে নিরাপত্তা জামানতে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশের ব্যাংক খাতে মাত্র এক বছরেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা দেশের মোট আমানতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এসব মন্দ ঋণের বিপরীতে যে ২৪টি ব্যাংক সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঘাটতি ৮২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে পরিচালন মুনাফার ০.৫ থেকে ৫ শতাংশ সাধারণ শ্রেণির ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে হয়; নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ এবং সন্দেহজনক খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ রাখতে হয়। এ ছাড়া প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মন্দ বা লোকসান শ্রেণির খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন আলাদা করে রাখার বিধান রয়েছে।
প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ, এটি ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যা মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণের ফল। ব্যাংকাররা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকগুলো যেসব ঋণ বিতরণ করেছে তার বিপরীতে তারা নিরাপত্তা জামানতও ঠিকভাবে নেয়নি।
এস আলম, সালমান এফ রহমানসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে যেসব জামানত নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল অতিমূল্যায়িত। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ব্যবসায়ী একই সম্পদ একাধিক ব্যাংকে জামানত রেখেছেন। এসব ঋণ খেলাপি হলেও ব্যাংকগুলো জামানত হিসেবে রাখা সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। কখনো আদালতের নির্দেশে বিক্রির প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা সম্পদ বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ক্রেতারা ঝামেলার ভয়ে আগ্রহী হন না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, জামানত রাখা সম্পদের অতিমূল্যায়ন। এজন্য ঋণগুলো খেলাপি হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১০ ব্যাংকের ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এই তালিকায় ১৪টি ব্যাংক যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
তবে কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত প্রভিশনের বেশি সংরক্ষণ করায় দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ঘাটতি ২৫৯ কোটি। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশনে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৮৭ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন ব্যাংকের যে অবস্থা, তাতে প্রভিশন ঘাটতি আরও বাড়বে। কারণ, দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সবচেয়ে মন্দমানের খেলাপি ঋণে শতভাগ প্রভিশন রাখা দরকার। কারণ, একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। এভাবে প্রভিশন বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলো আরও দুর্বল হয়ে যাবে। প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে আগে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে দিতে হবে, যাতে টাকাগুলো আবার ফেরত আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির এই প্রভিশন ঘাটতির মূলে রয়েছে উচ্চ খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এসব খেলাপি ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণে পরিণত হয়েছে ৯৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা ডিএসজেকে বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণে অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এতে প্রভিশনেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি ঋণগুলো পুনরুদ্ধারের। এজন্য আমরা অনেকগুলো মামলা করেছি। এছাড়াও অন্যান্য পদক্ষেপও চলমান রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। পঞ্চম অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২১ হাজার ৩৮৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ১৯ হাজার ৫১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ হাজার ২৫৭ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৭৪ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ১১ হাজার ৭০৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০ হাজার ৪৮ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৮১ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি, ইউসিবি ব্যাংকের ৪ হাজার ৩০৬ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৬৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১ হাজার ৬৭২ কোটি, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১ হাজার ৫৫৫ কোটি, এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৪৯০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ হাজার ১২৫ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৬৩৬ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬১৫ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ২৭০ কোটি, কৃষি ব্যাংকের ২৫৯ কোটি, বিডিবিএলের ৪০ কোটি এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকের ৭ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।











