তফসিলের আগে ব্যাংকিং ঘিরে কেন কথার ঝড়?

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতি থাকলে তারা কর্মীদের প্রণোদনা বা পারফরম্যান্স বোনাস দিতে পারবে না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া ঘোষণা, টাকা তুলতে না পেরে একীভূত হওয়া বেসরকারি পাঁচ শরিয়া ব্যাংকের আমানতকারীদের আল্টিমেটাম, ব্যাংকগুলোর কোটিপতি গ্রাহক হিসাব থেকে মাত্র তিন মাসে ৫৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা উত্তোলনের খবর, সঙ্গে গভর্নরসহ সরকারের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তার মন্তব্য—সব মিলিয়ে ব্যাংকখাতের অস্থিতিশীলতা ও সংস্কারের বিষয়টি বেশ আলোচনায় ছিল চলতি সপ্তাহজুড়ে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও সংবিধান সংশোধনে গণভোটের তফসিল ঘোষণার এই সপ্তাহে সরকার প্রধানের প্রেস সচিব শফিকুল ইসলাম দেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর অভিযোগও তুলেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সপ্তাহের শুরুতেই (৭ ডিসেম্বর) জানা যায়, দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি গ্রাহকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ) তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) কোটিপতি হিসাব বেড়েছিল ৫ হাজার ৯৭৪টি। আর তৃতীয় প্রান্তিকে (জুন–সেপ্টেম্বর) বেড়েছে আরও ৭৩৪টি। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর শেষে দেশে কোটিপতি হিসাব হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০টি। জুন মাস শেষে যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি। এর আগের মার্চ শেষে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৩৬২টি। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব হিসাব থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। জুন শেষে কোটিপতি হিসাবগুলোর মোট আমানত ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে কোটিপতি হিসাব থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।

একই দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে দ্রুত আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে সাধারণ গ্রাহকেরা টাকা তুলতে পারবেন। কিন্তু সেই সপ্তাহ পেরিয়ে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহও শেষ হতে চললেও ব্যাংকগুলো এখনো টাকা দিচ্ছে না। গ্রাহকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, আর কত সপ্তাহ পর তাঁরা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাবেন।

ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানতকারী আলিফ রেজা বলেন, “আমাদের কষ্টের টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত থাকা সত্ত্বেও সেটি তুলতে না পারায় বাবা–মায়ের চিকিৎসা, সন্তানের স্কুলের বেতন, ব্যবসায়িক কাজ ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে পারছি না। এখন আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ব্যাংকের লেনদেন দ্রুত স্বাভাবিক করা হোক।” এক্সিম ব্যাংকের সাভার শাখার ভুক্তভোগী মেরিনা হক বলেন, “গভর্নর আশ্বাস দিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহ থেকে এই পাঁচ ব্যাংকের লেনদেন স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আজ সকালেও আমি এক্সিম ব্যাংকের গুলশান শাখায় গিয়ে টাকা তুলতে পারিনি। আমাদের আজকের সংবাদ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো—আমরা একটি নির্দিষ্ট তারিখ চাই।” দাবি মানা না হলে আগামী ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করারও ঘোষণা দেওয়া হয় সেই সংবাদ সম্মেলনে।

পরদিন পরিকল্পনা কমিশনের এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখেও ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তিনি দাবি করেন, “সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আর্থিক খাত এখন একটি টেকসই ভিত্তির দিকে এগোচ্ছে এবং সেখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”

গভর্নর আরও বলেন, “প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরে কম দেখানো হচ্ছিল। স্বচ্ছতা আনার পর দেখা গেছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশেরও বেশি, যা স্বীকার করতে অস্বস্তিকর হলেও এটি বাস্তব সত্য।” তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা যাবে।

গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে, পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসান প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি আমানত বীমা আইন, ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশও পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। একীভূত নতুন ব্যাংকগুলো প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রথম বা দ্বিতীয় বছরের মধ্যেই লাভজনক অবস্থায় যেতে পারে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘লভ্যাংশ নয়, বোনাস নয়’ নীতিমালা কঠোরভাবে কার্যকর রয়েছে।” যেসব কর্মকর্তা প্রদত্ত ঋণ দ্রুত খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানায়, “মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতি থাকা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কর্মীদের প্রণোদনা বা পারফরম্যান্স বোনাস দিতে পারবে না।” আগে ঘাটতি থাকলেও ব্যাংকগুলো এ ধরনের বোনাস বিতরণ করতে পারত। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, প্রণোদনা বোনাস কেবল চলতি বছরের প্রকৃত আয় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্জিত মুনাফা থেকে দেওয়া যাবে। পূর্ববর্তী বছরের সঞ্চিত আয়ের ভিত্তিতে কোনো বোনাস দেওয়া যাবে না। পরদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি আরো জানান, আগামী নির্বাচনের পর বেসরকারি খাতের চাহিদা বিবেচনা করে মুদ্রানীতির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

একই দিন পাঁচটি দুর্বল বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে পরিচালনার জন্য গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রথম চেয়ারম্যান সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া তিন বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গ্রাহকেরা দ্রুত আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার জোর দাবি জানানোর দুই দিন পর তিনি এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন

ট্রুথ কমিশন জরুরি: ড. সিদ্দিকী

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের ব্যাংকখাতে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের ফলে বর্তমানে ৩৫ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত ড. লুৎফে সিদ্দিকী। তফসিল ঘোষণার দিনে (১১ ডিসেম্বর) তিনি ব্যাংকখাতের সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অনেক খেলাপি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তথ্যই এখন পাওয়া যাচ্ছে না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ব্যাংকখাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা শীর্ষক আলোচনায় কথা বলছিলেন তিনি। ড. সিদ্দিকী বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও স্থানীয় বাস্তবতা মিলেই আজকের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে কোনো ‘সিলভার বুলেট’ নেই। দরকার বহু দিক থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ। ব্যাংকের পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, যদি কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবারের সদস্য হন, বাস্তবে কীভাবে তা সামাল দেব—এখনই সে প্রেক্ষাপট বোঝার সময়।

তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এখন সাধারণ মানুষের জন্যও বিপজ্জনক। ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয় সুদ পরিশোধ এবং দেশের কম কর-জিডিপি অনুপাত—এসব বিষয়ের গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক সংকট, পরবর্তী সময়ে সুদহার পরিবর্তন ও ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব ব্যাখ্যা করে ড. সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশের ব্যবসায়িক মডেল আর আগের মতো কাজ করছে না; ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও নতুন বাস্তবতায় খাপ খাওয়াতে হবে।”

ব্যাংকিং পুনর্গঠনে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে তিনি দেখেন—ডিপোজিটের বৃদ্ধি সঠিক বিনিয়োগে পরিণত না হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঋণ খেলাপিদের পুনর্বহাল করা হয়, যা গভর্ন্যান্স সংকটকে আরও বাড়ায়। তাঁর মতে, আচরণগত ও শৃঙ্খলাগত উন্নয়নের জন্য মনোবিজ্ঞানী, আচরণ বিশেষজ্ঞসহ পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এজন্যই তিনি খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অপরাধের কৌশল বিশ্লেষণে একটি ট্রুথ কমিশন জরুরি বলে মন্তব্য করেন

সাহসী পদক্ষেপ চাইছেন ড. আখতার

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আখতার হোসেন বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের চাপ মিলিয়ে ব্যাংক খাত এমন ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে, যা এড়িয়ে গেলে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হবে। সময় দিলেই সংকট কাটবে না—এখনই সাহসী কাঠামোগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ড. আখতার বলেন, “ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মূলধন ঘাটতি এবং বড় খেলাপিদের প্রতি নরম মনোভাব সংকট গভীর করেছে।” তাঁর ভাষ্য, সংস্কারমূলক কঠোর পদক্ষেপ নিলে স্বল্পমেয়াদে চাপ বাড়বে কিন্তু স্থিতিশীলতার জন্য তা অপরিহার্য। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রানীতি পরিচালনা এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি যোগ করেন, “জনগণের আস্থা কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষণাও কার্যকর হচ্ছে না। কঠোর মুদ্রানীতি ও ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা—এই দ্বৈত সংকেত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।”

ড. আখতারের মতে, ফিলিপস কার্ভ সমতল হয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি কমাতে আরও উচ্চ সুদহার প্রয়োজন, যা অর্থনীতি নিতে পারছে না। তাছাড়া উচ্চ খেলাপি ঋণ, ডলারের অস্থিরতা, রেটিং এজেন্সির নেতিবাচক মূল্যায়ন—সবই মুদ্রানীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপির হার ৩৫ শতাংশ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও মারাত্মক। তিনি বলেন, “প্রবৃদ্ধি ৩.৮–৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যার অন্যতম কারণ—মূলধন পাচার ও কম বিনিয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। কারণ—উচ্চ খেলাপি, মূল্যস্ফীতি, নীতি–অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবে স্বাধীন নয় তবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ এমন যে, স্বাধীন হলেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতো। ১৯৭২ সালে ব্যাংক জাতীয়করণের মাধ্যমে একটি স্বার্থগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়, যা এখনো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে—এটিকেই তিনি ব্যাংকিং খাতের ‘অরিজিনাল সিন’ (আদিপাপ) হিসেবে উল্লেখ করেন।”

গভর্নর মার্জার করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—কেন ৫–৭টি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক আলাদা অবস্থায় থাকবে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ দিয়ে ড. আখতার একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্যাংক গঠনের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, নেতৃত্ব সংকট ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এক ধাপে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন ধাপে ধাপে সংস্কার, আস্থা পুনর্গঠন ও আর্থিক খাতকে জনস্বার্থে ফিরিয়ে আনা। ব্যবস্থা পরিষ্কার না করলে বাংলাদেশ আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়বে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

কঠোর সংস্কার প্রত্যাশী ড. আশিকুর

পিআরআই কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, “বহু বছরের অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় ব্যাংক খাত আজ ভঙ্গুর। তাঁর মতে, দ্রুত ও কঠোর সংস্কার ছাড়া উত্তরণের পথ নেই।” তিনি উল্লেখ করেন, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে এবং একটি দক্ষ ও সচেতন পেশাদার গোষ্ঠী তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ড. আশিকুর জানান, ব্যাংক ধসের মূল কারণ ইনসোলভেন্সি ও লিকুইডিটি সংকট। উচ্চ এনপিএল, দুর্বল প্রভিশন, এভারগ্রিনিং, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ধস, ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা—এসব মিলিয়ে অনেক ব্যাংক দেউলিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার আমানতকারীদের আস্থা কমে গেলে তারল্য সংকট দেখা দেয়; ২০২৪ সালের আগস্টে এর স্পষ্ট চিত্র দেখা গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংক ভেঙে পড়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ‘জম্বি ব্যাংকিং’ তৈরি হয়, যা ঋণের প্রবাহ কমিয়ে অর্থনীতিকে স্থবির করে। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত রেজোলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক গ্রহণের ওপর তিনি জোর দেন। স্ট্রেস টেস্টিং, রিকভারি প্ল্যান, ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স, রেজোলিউশন ফান্ড—সবই শক্তিশালী করতে হবে।

৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকার খেলাপি ঋণকে তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতারণাজনিত ও সাধারণ খেলাপি ঋণ আলাদা করে পেশাদার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে চার নেতিবাচক চক্রে ফেলছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, কম বিনিয়োগ ও কম প্রবৃদ্ধি। আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা সবাই একমত—ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল গভর্ন্যান্স ও আস্থাহীনতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। দ্রুত, ধাপে ধাপে এবং আস্থানির্ভর সংস্কার ছাড়া ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়

যা বলেছিলেন মাশরুর আরেফিন

পিআরআইয়ের আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাশরুর আরেফিন। তিনি বলেন, “সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পতনের দিকে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ, উদীয়মান অর্থনীতিতে একটি ব্যাংকের ধসই পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, ব্যাংক সংকটের মূল দুটি কারণ—পর্ষদের অনিয়ম এবং ক্রয়ে অস্বচ্ছতা। “অনেক পরিচালক ঋণ দেওয়ার সময় ভেন্ডরের মতো আচরণ করেছেন।”

তাঁর ভাষ্য, দেশের পাঁচটি বড় ব্যাংকের সংকট এখন স্পষ্ট। আরও পাঁচ–দশটি একই ধাপে রয়েছে। কিছু ব্যাংক লুটপাটের শিকার হয়েছে তবে অতীত বদলানো সম্ভব নয়—এখন সমাধান খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আমানত ও মূলধন দুটি ভিত্তিতেই ব্যাংক দ্রুত আস্থা ফিরে পেতে পারে। তিনি যোগ করেন, “সঠিক ব্র্যান্ডিং, ইমেজ বিল্ডিং, অ্যাকাউন্টেবিলিটি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সংকটাপন্ন ব্যাংক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন শক্তিশালী ব্যাংক তৈরি হলে সেটি দেশের সবচেয়ে বড় ইকুইটিভিত্তিক ব্যাংক হতে পারে।”

মাশরুর বলেন, “মানুষ ব্যাংকিং সিস্টেমে আস্থা হারায়নি; হারিয়েছে কিছু অনিয়মকারী গোষ্ঠীর প্রতি।” সিটি ব্যাংকের আমানত মাত্র নয় মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে—এ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের আস্থা ঠিকই আছে। তাঁর মতে, সিস্টেমে তারল্য সংকট নেই; বরং ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত আস্থা ও কিছু ব্যাংকে অবিশ্বাসের কারণে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রায় ২.৮৭ ট্রিলিয়ন টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে; এটি আনতে পারলে খাত শক্তিশালী হবে।

যে ভাষ্য সরকার প্রধানের মুখপাত্রের

দেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর অভিযোগ করে সোমবার (৮ ডিসেম্বর) পরিকল্পনা কমিশনের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “সরকারের অর্জন ও বাস্তব চ্যালেঞ্জের সঠিক চিত্র উপস্থাপনের বদলে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে মিশ্র ও ভ্রান্ত বার্তা তৈরি করছে।” তাঁর অভিযোগ, গত ১৬ মাসে কিছু গণমাধ্যম ও আলোচক একপেশে তথ্য ব্যবহার করে পরিস্থিতি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন।

শফিকুল বলেন, “অল্পসংখ্যক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বক্তব্য অতিরিক্ত গুরুত্ব পায়; অথচ দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সরকারের নীতিগত কাজগুলো আলোচনার বাইরে থাকে।” প্রেস সচিবের দাবি, “প্রধান উপদেষ্টা প্রতিদিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্থনৈতিক টিম গড়ে দেশকে আবার প্রবৃদ্ধির পথে আনার জন্য কাজ করছে। এই অর্জনগুলো যথাযথভাবে সামনে আসছে না।” আলোচিত এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “যে সব বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে—সেগুলো বললে সমস্যা নেই। কিন্তু যে সব বিষয়ে সরকারের দায় নেই সেগুলোও সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে, যা হতাশাজনক।”

ঠিক দুই মাস আগে (৮ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে মসৃণ ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রণীত মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের জন্য গঠিত জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভা শেষে শফিকুল বলেছিলেন, “শেখ হাসিনার আমলে যে বড় আকারে চুরি হয়েছে, ব্যাংকগুলো যেভাবে খালি করে দেওয়া হয়েছে, সেই কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের হেলথ আমরা এখনও ঠিকমতো পুনঃস্থাপন করতে পারিনি, এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে।” তিনি আরও জানিয়েছিলেন, “সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা আশাতীত সাফল্য পেয়েছি। তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে চার–পাঁচ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে আর নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করা হবে।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top