বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়নের যে জৌলুসপূর্ণ বয়ান প্রচার করা হয়েছিল, বিবিএসের সর্বশেষ তথ্যে তার এক কঙ্কালসার চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দশকে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা নতুন ইউনিট তৈরির প্রবৃদ্ধির গতি আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যেখানে অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১১ শতাংশ, সেখানে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সময়কালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪৯.৬৮ শতাংশে। উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ডামাডোলে ঢাকা পড়ে থাকা এই কাঠামোগত ধীরগতি এবং শিল্প খাতের আশঙ্কাজনক সংকোচন এখন দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ও প্রবৃদ্ধির হার ১৯৯৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই শুমারির তথ্য তুলে ধরা হয়, যেখানে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং শিল্প খাতের আশঙ্কাজনক সংকোচনের চিত্র উঠে এসেছে।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এই সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। অর্থাৎ গত ১০ বছরে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে এই বৃদ্ধি ইতিবাচক মনে হলেও ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি গত ২৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগের দশকে (২০০৩ থেকে ২০১৩) অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছিল ১১১ শতাংশ। সেই তুলনায় গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির গতি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।
বিবিএস-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি অর্থনৈতিক ইউনিট হলো মুনাফা বা পারিবারিক লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো স্থাপনা বা অর্থনৈতিক খানা। ১৯৯৬ সালে দেশে এমন ইউনিটের সংখ্যা ছিল ২১.৬৮ লাখ। ২০০৩ সালে তা ৭১ শতাংশ বেড়ে ৩৭ লাখে পৌঁছায়। কিন্তু সাম্প্রতিক শুমারিতে এই প্রবৃদ্ধির হার ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন খাতের চেয়ে সেবা খাতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন সেবা খাতের দখলে। অন্যদিকে জিডিপির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প খাতের অবদান আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০১৩ সালে যেখানে মোট ইউনিটের ১১ শতাংশ ছিল শিল্প খাতের, ২০২৪ সালে তা কমে ৯.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শিল্পের আকার অনুযায়ী মোট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাইক্রো ও কুটির শিল্পই সিংহভাগ এলাকা দখল করে আছে, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ। বিপরীতে বৃহৎ শিল্পের হার মাত্র ০.০৮ শতাংশ, যা দেশের কর্মসংস্থান ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির হার ১৯৯৬ সালের পর সর্বনিম্ন রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে এই অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন মানুষ নিয়োজিত রয়েছেন, যা ২০১৩ সালের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশ বেশি। কর্মসংস্থানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৩.২৮ শতাংশ হলেও নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৬.৭১ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। গত দশ বছরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার হার ছিল মাত্র দশমিক ১৭ শতাংশ, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ধীরগতির পরিচায়ক।
শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও গ্রামে এই বৃদ্ধির হার শহরের তুলনায় কম। বর্তমানে দেশের ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট গ্রামাঞ্চলে এবং ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ইউনিট শহরে অবস্থিত। তবে এই ইউনিটের বড় অংশই হচ্ছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা (৪০.১৯ শতাংশ) এবং পরিবহন ও গুদামজাতকরণ খাত (২২.২২ শতাংশ)। উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে ট্রেডিং ও ক্ষুদ্র সেবা খাতের এই আধিপত্যকে বিশ্লেষকরা ‘অনুৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিবিএস-এর এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে সরকার কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিগত সরকারের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং মূল্যস্ফীতির তথ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হারের তুলনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে অনুপাত দেখানো হয়েছে, তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে বেশি। এছাড়া প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার অর্থনৈতিক ইউনিট এই শুমারি থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
টাস্কফোর্সের সমালোচনা অনুযায়ী, বিবিএস একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। তথ্য প্রকাশের আগে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অনুমতির প্রয়োজনীয়তা পরিসংখ্যানের নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছে। এছাড়া ‘প্রজেক্ট কালচার’ বা প্রকল্প-নির্ভরতার কারণে মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের গুণমান বজায় থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী কাঠামোর বদলে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ হওয়ায় তথ্যের ধারাবাহিকতাও নষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বয়ান এবং অন্যদিকে শিল্প খাতের সংকোচন ও অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যায় ধীরগতি—এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে দেশের অর্থনীতি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শিল্প খাতের সম্প্রসারণ জরুরি হলেও বর্তমানে তা উল্টো পথে হাঁটছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্যগুলো নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।













