স্থলে নয়, সাগরেই গ্যাসের ভাসমান কারখানা

ডিএসজে
ডিএসজে

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের উপকূলের অগভীর জলসীমায় নোঙর করা এক বিশাল ভাসমান গ্যাস কারখানা গত সপ্তাহে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। একসময় যে প্রযুক্তি ব্যয়ের কারণে মূলধারার বাইরে ছিল, সেটিই এখন ধীরে ধীরে মূলধারায় আসছে।

ইতালির জ্বালানি জায়ান্ট এনি পরিচালিত ‘নগুয়া’ বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর চেয়েও দীর্ঘ। যখন ৩০০ মিটার লম্বা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার প্রথম কার্গো তুলতে এটির পাশে আসে, তখন সেটিও তুলনায় অনেক ছোট দেখায়। ৩৭৬ মিটার দীর্ঘ ও ৬০ মিটার প্রস্থের নগুয়া ইউনিটটি ৩৫ মিটার গভীরতায় নোঙর করা যায়।

সমুদ্রে ভাসমান উজ্জ্বল কমলা রংয়ের জাহাজের ওপরে অনেক পাইপ, টাওয়ার, টারবাইন আর কুলিং মেশিন বসানো আছে। দেখতে অনেকটা লোহার জঙ্গলের মতো লাগে। এই যন্ত্রগুলো সমুদ্রের নিচে থাকা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস তুলে আনে। প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন টন গ্যাস এখানে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।

গ্যাসকে সরাসরি পাঠানো কঠিন। তাই এটিকে খুব বেশি ঠান্ডা করা হয়। তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনা হয়। এত ঠান্ডা করলে গ্যাস তরলে পরিণত হয়। তখন এর আয়তন নাটকীয়ভাবে অনেক কমে যায়।

আর আয়তন কমে যাওয়ায় গ্যাসকে জাহাজে করে দূরে পাঠানো সহজ হয়। এভাবেই স্পেন ও ইতালিতে গ্যাস পাঠানো সম্ভব হয়।

অনেক বছর ধরে গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার কাজ মূলত স্থলভাগে হতো। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে বড় বড় এলএনজি টার্মিনাল বানানো হয়েছে। সেখানে গ্যাস ঠান্ডা করে তরলে পরিণত করা হতো।

কিন্তু তেল কোম্পানিগুলো আরও বড় পরিকল্পনা করেছিল। তারা চেয়েছিল সমুদ্রের মাঝখানেই ভাসমান কারখানা বানাতে। কারণ অনেক গ্যাসক্ষেত্র সমুদ্রে এমন জায়গায় আছে, যেখানে পাইপলাইন পৌঁছায় না। তাই তারা ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট তৈরির স্বপ্ন দেখছিল।

শুরুর দিকে এই চেষ্টা সফল হয়নি। অস্ট্রেলিয়ায় শেল কোম্পানি ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ‘প্রিলিউড’ নামে একটি বড় জাহাজ বানায়। কিন্তু এতে অনেক খরচ বেড়ে যায় এবং পরিচালনায় নানা সমস্যা হয়। এতে অনেকেই সন্দেহ করতে শুরু করে, ভাসমান এলএনজি আদৌ লাভজনক হবে কি না।

তবে এখন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি বদলেছে। প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে। খরচ ও পরিকল্পনাও আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তাই তারা মনে করছেন, এখন এই প্রকল্প সফল হতে পারে।

কঙ্গোর পয়েন্ট নোয়ার বন্দরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনির প্রধান নির্বাহী ক্লদিও দেসকালজি বলেন, “আমি নতুন উপায়ে কাজ করতে এবং প্রযুক্তিকে আরও প্রসারিত করতে পছন্দ করি।”

এনির বিশ্বাস, ভাসমান প্ল্যান্ট গতি, নিরাপত্তা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়। বিশেষ করে এমন অঞ্চলে যেখানে স্থলভাগে অবকাঠামো নির্মাণ লজিস্টিকভাবে জটিল বা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

Claudio Descalzi

এনির প্রধান নির্বাহী ক্লদিও দেসকালজি

এবিষয়ে তিনি আরও বলেন, “আগে স্থলভাগে এলএনজি উন্নয়ন করা সহজ ছিল। কিন্তু এখন তা সহজ নয়। এটি খুব কঠিন হয়ে গেছে। মোজাম্বিকে কী ঘটছে দেখুন।” তিনি ইঙ্গিত করেন টোটালএনার্জিসের ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি স্থলভিত্তিক প্রকল্পের দিকে, যা ২০২১ সালের এক প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার কারণে পাঁচ বছর দেরি হয়।

এর বিপরীতে, হামলার স্থান থেকে কয়েক ডজন মাইল দূরে সমুদ্রে অবস্থিত এনির ‘কোরাল সাউথ’ জাহাজটি ২০২২ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। “নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এটি সত্যিই সমুদ্রের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। যেকোনো অবস্থাতেই এটি একটি পরিচ্ছন্নতর প্রক্রিয়া।” বলেন দেসকালজি।

নগুয়া নির্মাণ করেছে চীনের উইসন। তিন বছরেরও কম সময়ে এটি সরবরাহ করা হয়েছে। এর বিশাল জাপানি নকশার স্টোরেজ ট্যাংকগুলো আলাদাভাবে তৈরি করে পরে হালের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এনির ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে সময় বেঁচেছে। এলএনজি বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতাহীন কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একটি প্রচলিত স্থলভিত্তিক প্ল্যান্ট নির্মাণে আরও বেশি সময় লাগত। আর খরচও বেশি হতো বলে জানান দেসকালজি।

তার হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্টের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। প্রতি বছরে ১০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার জন্য ব্যয় নেমে এসেছে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে। সে হিসাবে নগুয়ার মূল্য ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারেরও কম হওয়া উচিত।

তবে প্রকল্পের মোট ব্যয় সম্ভবত আরও বেশি। কারণ এনিকে বিদ্যমান ভাসমান প্ল্যাটফর্ম ‘স্কারাবেও ৫’-কে রূপান্তর করে একটি প্রি-ট্রিটমেন্ট জাহাজে পরিণত করতে হয়েছে, যা সমুদ্রতলের কূপ থেকে উঠে আসা গ্যাসকে তেল ও অন্যান্য তরল থেকে পৃথক করে।

ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট স্থলভিত্তিক স্থাপনার মতো বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে পারে না, এমন উদ্বেগ দেসকালজি উড়িয়ে দেন। তিনি আর্জেন্টিনার ‘ভাকা মুয়ের্তা’ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি এমন একটি জাহাজ বহর মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছেন, যার প্রতিটি নগুয়ার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বড় হবে এবং শেষ পর্যন্ত বছরে ১৮ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদনে সক্ষম হবে। এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বড় রপ্তানি টার্মিনালের সমতুল্য।

শেলের মতো তেল জায়ান্টরা ভাসমান এলএনজির প্রাথমিক পথিকৃৎ ছিল। তবে এই খাতে নতুন অপারেটরও আকৃষ্ট হচ্ছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত গোলার। তারা পুরোনো ট্যাংকারকে ভাসমান এলএনজি ইউনিটে রূপান্তর করে এবং বিশাল অগ্রিম বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে না চাওয়া উৎপাদকদের কাছে তা ভাড়ায় দেয়।

গোলারের একটি জাহাজ ‘গিমি’ বর্তমানে মৌরিতানিয়া ও সেনেগালের উপকূলের মাঝে সমুদ্রে অবস্থান করছে, বিপির কাছে ২০ বছরের লিজ চুক্তির আওতায়। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত শেয়ারের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

গিমির তরলীকরণ ইউনিট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক অ্যান্ড ভিচের ভাসমান এলএনজি বিশেষজ্ঞ কাইল হ্যাবারবার্গার বলেন, গোলারের প্রাথমিক সাফল্য এই শিল্পের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

“আমরা তাদের সঙ্গে প্রথম প্রকল্পটি ২০১৮ সালের দিকে শেষ করি। এটি যে একটি পরিচালনাযোগ্য প্রকল্প তা এতে প্রমাণ হয়েছে।” গত বছর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন তিনি।

আফ্রিকা এখন বিশেষ গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সেখানে অফশোর সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে, আবার স্থলভাগে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও আছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেনজির এলএনজি বিশ্লেষক ফ্রেজার কারসন বলেন, “সাম্প্রতিক স্মৃতিতেই আমরা স্থলভাগে কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে বিপুল অফশোর সম্পদও রয়েছে, সেখানে গ্যাস বাণিজ্যিকীকরণের প্রয়োজন।”

লাতিন আমেরিকা; বিশেষ করে গায়ানা ও সুরিনাম এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশও উদীয়মান বাজার হিসেবে উঠে আসছে।

যেসব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনকাল তুলনামূলকভাবে স্বল্প; সেগুলোর জন্য ভাসমান এলএনজি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে।

কারসনের মতে, “আপনার কাছে হয়তো এমন মজুত আছে যা মাত্র ১০ বা ১৫ বছর স্থায়ী হবে। সেক্ষেত্রে স্থলভিত্তিক বিনিয়োগের ব্যয় যৌক্তিক নয়। কিন্তু গোলারের সঙ্গে চুক্তি থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এটি মোতায়েন করা যায়, তারপর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।”

তিনি আরও জানান, জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো ব্যয় কমাতে আরও মানসম্মত নকশার দিকে এগোচ্ছে। “এটি পুরোপুরি প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে নয়, তবে খুব কাছাকাছি।” বলেন তিনি।

একটি জটিলতা হলো; গ্যাস, তেল ও তরলের উৎপাদনক্ষেত্রভেদে ভিন্নতা থাকে, যা তরলীকরণের আগে কতটুকু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করে।

বড় তেল কোম্পানিগুলোও এখন এদিকে ঝুকতে চাইছে। গত বছর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে এক্সনমোবিলের এলএনজি প্রধান পিটার ক্লার্ক বলেন, “ভাসমান প্রযুক্তি এলএনজি ব্যবসা সম্প্রসারণে সত্যিই সহায়ক হয়েছে।”

তবে তিনি সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন। সমুদ্রের গভীরতা, স্রোত ও আবহাওয়া প্রকল্প সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে একটি জাহাজের হালে কতটুকু সরঞ্জাম বসানো সম্ভব, সেটিও একটি অবকাঠামোগত সীমা। সাধারণত গ্যাস টারবাইনচালিত ভাসমান প্ল্যান্টগুলো স্থলভিত্তিক কিছু টার্মিনালে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ড্রাইভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। ফলে সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম পরিবেশবান্ধব।

শেভরনের বৈশ্বিক আপস্ট্রিম ব্যবসার প্রধান ক্লে নেফ বলেন, এই প্রযুক্তি “ক্রমাগত বিকশিত ও পরিণত হচ্ছে” এবং যেখানে “নমনীয়তা, সীমিত অবকাঠামোগত পদচিহ্ন ও দ্রুত বাজারে প্রবেশ গুরুত্বপূর্ণ” সেখানে এটি নির্ণায়ক প্রমাণিত হতে পারে।

এদিকে দেসকালজি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্যে এনির দৃঢ়তা ইতিমধ্যেই সুফল দিয়েছে।

তিনি বলেন, “যখন আর্জেন্টিনা তাদের অগভীর সমুদ্র উপকূলে গ্যাস উন্নয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা আমাদেরই ডাক দেয়। কারণ আমরা এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। সুতরাং এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top