দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে এবং আসন্ন এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় এই অনুরোধ জানায়।
সরকারি প্রণোদনায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুতা উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে কম মূল্যে তা রপ্তানি করা হচ্ছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় সুতার আমদানি বেড়েছে ১৫৭ শতাংশ। এর ফলে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পুরো খাতটি পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) অনুরোধে ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশে ১০–৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত থেকে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ আয় হয় নিট গার্মেন্টস থেকে। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী প্রতিযোগী দেশগুলো বিশেষ করে ভারত তাদের সুতা উৎপাদনকারী শিল্পে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি (যেমন: ক্যাপিটাল সাবসিডি, স্বল্প সুদে ঋণ, বিদ্যুৎ ভর্তুকি, বিক্রির ওপর আয়কর অব্যাহতি) দিচ্ছে, যার ফলে তাদের সুতার উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০–৩৫ সেন্ট কমে গেছে।
এর ফলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ২.৫০–২.৬০ মার্কিন ডলারে সুতা রপ্তানি করছে। এর বিপরীতে দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীরা উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশের সরকারি প্রণোদনায় সুতার দাম কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে আমদানি ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে যেখানে ৩৫ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৭০ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যাপক হারে বাইরে চলে যাচ্ছে।
ভারত থেকে সুতা আমদানির চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশটি থেকে ২১ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছিল, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫৪ কোটি কেজিতে উন্নীত হয়। ভারত থেকে ব্যাপক হারে ১০–৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমদানিকৃত সুতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অসম প্রতিযোগিতার কারণে বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। ইতিমধ্যে দেশীয় প্রায় ৫০টি বৃহৎ সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা এই খাতে লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সুতা আমদানির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অন্যান্য সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ ও জিএসপি প্লাস চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বিভিন্ন বাজারে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে না। এলডিসি-উত্তর শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান পণ্যের উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনের হার ৪০–৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা পেতে হলে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে।
ক্ষেত্রবিশেষে ‘ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ শর্ত পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ, দেশেই সুতা ও কাপড় উৎপাদন করে তা দিয়ে পোশাক তৈরি করতে হবে। এই সক্ষমতা ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজারে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাস্টমস ট্যারিফের আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বিদ্যমান কড়াকড়ি বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের পক্ষে মত দিয়েছে। বিশেষ করে বিল অব এন্ট্রিতে সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার শর্তে এনবিআরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই পদক্ষেপের ফলে পোশাক খাতের লিড টাইম কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের দ্রুত পদক্ষেপ রপ্তানি বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সহায়ক হবে বলে চিঠিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের এপ্রিলে ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করা হয়।













