দেশের আবাসন শিল্প বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট, নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে এই শিল্প এখন রুগ্ন দশায় উপনীত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘রিহ্যাব’ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তিন হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং গৃহঋণের সুদের হার একক অংকে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে সংগঠনটি তাদের লিখিত প্রস্তাবনা তুলে ধরে।
বৈঠকের পর রিহ্যাব সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “আবাসন খাত কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই শিল্পের সঙ্গে ২৭০টিরও বেশি উপ-খাত এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। তবে বর্তমানে খাতটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।”
রিহ্যাব জানায়, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ‘ড্যাপ’-এর কারণে ঢাকায় ভবন নির্মাণের উচ্চতা ও জমির ব্যবহার সংকুচিত হয়েছে, যা ফ্ল্যাটের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত দুই বছরে নির্মাণ সামগ্রীর দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। এছাড়া বর্তমানে গৃহঋণের সুদের হার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে দেওয়া লিখিত প্রস্তাবে রিহ্যাব জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় আবাসন খাতকে ‘অনুৎপাদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকট উত্তরণে রিহ্যাব সাতটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে, যার মূল লক্ষ্য খাতটিকে ‘উৎপাদনশীল’ হিসেবে ঘোষণা করা এবং গ্রাহকদের জন্য ঋণ সুবিধা সহজীকরণ করা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলা ও নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। একই সঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ৩০ বছর মেয়াদি একক অংকের সুদের হারে গৃহঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং যারা প্রথমবার বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কিনছেন, তাদের জন্য ডাউন পেমেন্ট কমানো ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আবাসন প্রকল্পগুলোতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, গ্রিন বিল্ডিং এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রণোদনা প্রদান এবং ব্যাংক ঋণের দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। রিহ্যাব মনে করে, সরকারের পক্ষ থেকে আবাসন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নীতিসহায়তা দেওয়া হলে গৃহায়ন সমস্যার সমাধানসহ দেশের জিডিপিতে এই খাত আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।













