সংকট না সম্ভাবনা: কোন পথে হাঁটছে অর্থনীতি?

ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি আর অভ্যন্তরীণ উৎসবের প্রস্তুতির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন এক জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ মেলাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামকে উসকে দিচ্ছে, তখন দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগের মেঘ।

তবে এই অন্ধকারের মাঝেও আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান।

দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন একদিকে যেমন তারল্য সংকট নিরসনে নীতি পরিবর্তন করছে, অন্যদিকে তেমনি পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। বুধবার (১১ মার্চ) বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে উদ্যোক্তারা জানান, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল না থাকায় তারা শ্রমিকদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা আমানত নগদায়ন করতে না পারা শিল্প মালিকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট কাটাতে এখন থেকে প্রতি মাসের নগদ সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট মাসেই ছাড় করা হবে।

এছাড়া রপ্তানি ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা এবং প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন স্কিমের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবগুলোও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

পোশাক খাতের শঙ্কার বিপরীতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বইছে স্বস্তির বাতাস। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনেই দেশে ১ হাজার ৭৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫১.৭ শতাংশ বেশি।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত সংগৃহীত মোট ২৪ হাজার ১৯১ মিলিয়ন ডলারের এই প্রবাহ দেশের ডলার সংকট কাটাতে জাদুর মতো কাজ করছে।

রেমিট্যান্সের এই জোয়ারের প্রভাবে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ এখন ২৯.৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে (বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসারে), যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক শক্তিশালী জানান দেয়।

আমদানির চাপ সামাল দেওয়া এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এই মজবুত রিজার্ভ এখন সরকারের বড় শক্তির উৎস।

ট্রেজারি বন্ডে ঋণ: তারল্য বৃদ্ধিতে নতুন কৌশল

আর্থিক বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে বুধবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে সরকারি ট্রেজারি বন্ড (টি-বন্ড) বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন গ্রাহকরা।

এই লিয়েন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজকে আনুষ্ঠানিক জামানত হিসেবে ব্যবহারের পথ খুলে দেওয়া হলো।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বন্ডের মূল মূল্যমানের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে শেয়ার বাজার ও মানি মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের তারল্য সংকট অনেকাংশে কমে আসবে এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

দেশের অভ্যন্তরে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘প্রি-সুট মিডিয়েশন’ বা মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার ওপর জোর দিয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেওয়ানি মামলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

প্রথম ধাপে ছয়টি বড় মামলা নির্বাচন করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০টির বেশি মামলা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আর পোশাক শিল্পের রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের ইতিবাচক ধারা সেই ধাক্কা সইবার সক্ষমতা দিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী সংস্কার এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কঠোর অবস্থান যদি সফলভাবে কার্যকর হয়, তবে বৈশ্বিক এই মহাযুদ্ধের মাঝেও বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

দেশের সাধারণ আমানতকারী ও উদ্যোক্তারা এখন তাকিয়ে আছেন এই সংস্কারগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়নের দিকে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top