পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনের বর্তমান অবস্থান নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একাধিক সূত্র ডিএসজে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে, গত বছর এক বিশেষ শুনানিতে অংশ নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ। সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যে জোর আলোচনা চলছে যে, শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাঁর দুই মেয়ের কাছে পাড়ি জমিয়েছেন।
অধ্যাপক খায়রুল হোসেনের মেয়াদে হওয়া অসংখ্য অনিয়মের মধ্যে বর্তমানে দুটি বড় অভিযোগের তদন্ত ও শুনানি চলমান। এর একটি হলো—বেস্ট হোল্ডিংসের বন্ড ইস্যু, যেখানে আইন লঙ্ঘন করে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের অন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অন্যটি কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও; আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ থাকার পরও কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) বাধ্য করেছিলেন খায়রুল হোসেন।
২০১১ সালের ১৫ মে বিএসইসিতে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন খায়রুল হোসেন। টানা নয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০২০ সালের ১৪ মে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যান। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন মোট ১০৮টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত হয়, যার অধিকাংশই বর্তমানে রুগ্ণ।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ আনে দুদক।
পরবর্তীতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবালের অনিয়মে সহযোগিতা ও বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকে অনিয়মের দায়ে পুঁজিবাজারে দুই দফায় আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় শিবলী রুবাইয়াতকে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে পুঁজিবাজারে কারসাজিতে সহায়তা ও দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির অভিযোগও রয়েছে। শিবলী রুবাইয়াত গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেন।
পেয়েছিলেন বিপদের সংকেত
বেস্ট হোল্ডিংসের তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ২০২৫ সালের মার্চে বিএসইসিতে এক বিশেষ শুনানির আয়োজন করা হয়। খায়রুল হোসেন ওই শুনানিতে উপস্থিত হতে গড়িমসি করলেও শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হয়ে নিজের পক্ষে সাফাই পেশ করেন। তবে কমিশন কর্মকর্তাদের জেরা ও অকাট্য দালিলিক প্রমাণের মুখে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ওই শুনানির পরই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরপর থেকেই তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি।
বিএসইসির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ড. খায়রুল হোসেনের দুই মেয়ে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। বেস্ট হোল্ডিংসের বন্ড অনিয়মের শুনানির পর সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি সুকৌশলে দেশত্যাগ করে মেয়েদের কাছে চলে গেছেন বলে জোরালো গুঞ্জন উঠেছে।
বিএসইসির ভেতর এটি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও তিনি কবে বা কোন পথে দেশ ছেড়েছেন, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁকে আর কোথাও খুঁজে না পাওয়ায় বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, খায়রুল হোসেনের বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখান থেকেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে চাকরিতে ইস্তফা দেন।
বিএসইসিতে শুনানির পর গত নভেম্বরে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন অনিয়ম খতিয়ে দেখতে খায়রুল হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুদক। তবে এর আগেই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বলে মনে করছেন বিএসইসির কর্মকর্তারা।
গত নভেম্বর থেকেই এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে খায়রুল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয়। প্রতিবারই তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেলেও হোয়াটসঅ্যাপ চালু ছিল। হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি; পাঠানো বার্তা দেখলেও কোনো জবাব দেননি।
বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, “একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে আমি মনে করি খায়রুল হোসেনের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। কারণ আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে যে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী আছেন, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করে তাঁদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন তিনি।”
“সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের মতো তাঁকেও জেলে পাঠানো উচিত ছিল। তিনি যদি বিদেশে পালিয়ে গিয়ে থাকেন, তবে বর্তমান সরকার কিংবা ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে—খায়রুল হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক,” যোগ করেন নুরুল ইসলাম।
বিএসইসি মুখপাত্র যা বললেন
খায়রুল হোসেনের বিরুদ্ধে চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজে প্রতিবেদককে জানান, খায়রুল হোসেনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ নয়, বরং ইনভেস্টিগেশন ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘হেয়ারিং কাম শোকজ’ (শুনানি ও কারণ দর্শানো) নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
“সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে কী কী আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। খায়রুল হোসেনের ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছিল। তিনি একটি অভিযোগের শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন। অন্য একটি অভিযোগের তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি,” বলেন এই কর্মকর্তা।
মুখপাত্র স্পষ্ট করেন যে, কেউ যদি শুনানিতে অংশ না নিয়ে পালিয়ে থাকেন, তবে তাঁর অনুপস্থিতিতেই বা ‘এক্স-পার্টি’ হিসেবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, “তাঁর মতামত না থাকলে বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী প্রসিডিং (কার্যধারা) তৈরি হবে এবং কমিশন নথিপত্র দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি উপস্থিত না থাকলেও প্রসিডিং থেমে থাকবে না। এখন তিনি যদি পালিয়ে যান, তাহলে তাঁর অনুপস্থিতিতেই শাস্তি ঘোষণা করা হবে।”
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এই সাবেক অধ্যাপক আওয়ামী লীগ আমলে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছিলেন।
বেস্ট হোল্ডিংস আর্থিক জালিয়াতি
বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের (লা মেরিডিয়ান হোটেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান) ৮৫০ কোটি টাকার বন্ডটি শেয়ারে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত আর্থিক জালিয়াতি। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাফিজ শরাফত ও তাঁর সহযোগীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কয়েক শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
সাধারণত কোনো কোম্পানি বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলতে চাইলে তার নিজস্ব মূলধন ও ঋণের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত থাকতে হয়। বেস্ট হোল্ডিংসের ঋণের বোঝা অনেক বেশি ছিল, যা বন্ড ইস্যুর যোগ্য ছিল না। খায়রুল হোসেনের কমিশন এই আইন থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়, যাতে তারা বন্ডের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারে।
শুধু তাই নয়, বন্ড ইস্যুতে শক্তিশালী ক্রেডিট রেটিং থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বেস্ট হোল্ডিংসের ক্ষেত্রে রেটিং সংক্রান্ত কিছু কঠোর শর্ত থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। অতালিকাভুক্ত কোম্পানির বন্ড ইস্যু ও পরবর্তী রূপান্তর নিয়ে যে কঠোর নিয়ম রয়েছে, সেখানেও আইনি ছাড় দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বন্ডের টাকা দিয়ে অন্য ঋণের সুদ পরিশোধ করার মতো অনৈতিক সুযোগকেও কমিশন প্রশ্রয় দিয়েছিল।
বন্ডটির শর্ত ছিল যে, নির্দিষ্ট সময় পর বন্ডহোল্ডাররা (যেমন: রেসের মিউচুয়াল ফান্ডগুলো) পাওনা টাকার বদলে বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার নিতে পারবে। এখানেই মূল জালিয়াতি করা হয়। যখন বেস্ট হোল্ডিংস আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসে, তখন তাদের শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হয় ৩৫ টাকা। কিন্তু সবচেয়ে বড় অসংগতি ছিল—রেসের মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে সেই একই শেয়ার বন্ড রূপান্তরের মাধ্যমে নিতে হয়েছিল ৬৫ টাকায়।
সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, একটি মিউচুয়াল ফান্ড তার মোট তহবিলের ১০ শতাংশের বেশি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারে না। খায়রুল হোসেনের কমিশন বিশেষ আদেশে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে এই সীমা ছাড়িয়ে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়, যা ছিল সবচেয়ে বড় অনিয়ম।
বিএসইসির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর প্রায় ২০০ থেকে ২২০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ দেখানো হয়েছে, যা মূলত নাফিজ শরাফতের পকেটে যাওয়া ‘লুটপাটের’ টাকা।
বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসার আগের দুই বছরের মধ্যে বোনাস শেয়ার ছাড়া অন্য কোনোভাবে মূলধন বাড়ানোর সুযোগ না থাকলেও বিএসইসির বিশেষ ছাড়ে বেস্ট হোল্ডিংস অগ্রণী ব্যাংকের ১২৫ কোটি টাকার বন্ডের বিনিয়োগকে শেয়ারে রূপান্তর করেছিল।
কপারটেকে বিতর্কিত ভূমিকা
কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আইপিও প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা ছিল। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি যখন বাজারে আসে, তখন সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে। ডিএসই ও সিএসইর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কোম্পানিটি তাদের বিক্রয় ও মুনাফা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল যাতে বেশি প্রিমিয়াম পাওয়া যায়।
তদন্তে দেখা যায়, কোম্পানিটি ব্যালেন্স শিটে যে পরিমাণ কাঁচামাল ও মজুত পণ্য দেখিয়েছিল, বাস্তবে কারখানায় তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তাদের স্থায়ী সম্পদের মূল্যায়ন নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন ছিল। কোম্পানির ভুল তথ্য যাচাই না করেই ‘ক্লিন রিপোর্ট’ দেওয়ার কারণে পরবর্তীকালে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘আহমেদ জাকের অ্যান্ড কোং’-কে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছিল।
কপারটেকের আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ডিএসই কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু ডিএসই আপত্তি জানালেও খায়রুলের কমিশন কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে।
এটি বাজারে একটি নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যেখানে স্টক এক্সচেঞ্জ অনিয়মের কারণে তালিকাভুক্ত করতে চায়নি, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমতি দিয়েছিল। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও আইপিও অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল।













