চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। দেশীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ভ্যাট আদায়ের ওপর ভর করে এ সময় মোট ২.২৪ লাখ কোটি টাকা সংগৃহীত হলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এনবিআর এখনো ২৭ শতাংশ বা ৬০ হাজার ১১০ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শেষে এই ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের বাড়ানো ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা গত নভেম্বরে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫.৫৪ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। এটি গত অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৪৯.৩ শতাংশ বেশি। গত আড়াই দশকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর এমন নজির মাত্র একবারই দেখা গেছে। লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী ৫ মাসে এনবিআরকে আরও ৩.৩০ লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদের রাজস্ব আদায়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড থেকে আসা ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) ছিল একক বৃহত্তম উৎস, যা মোট সংগ্রহের ৩৮ শতাংশ। এটি আগের বছরের তুলনায় ১৬.৪৫ শতাংশ বেড়ে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আয়কর ও করপোরেট করসহ প্রত্যক্ষ করের অবদান ছিল ৩৩.৫ শতাংশ, যা ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তুলনামূলক কম; ৮ শতাংশ বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকায়।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায়ের গতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি; যেখানে গত বছর প্রকৃত রাজস্ব আয়ে মাত্র ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম হয়েছিল। ঘাটতি সামাল দিতে উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি বাস্তবায়নে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হয়েছিল, যা ছিল গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এদিকে দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির সবচেয়ে নাজুক দিক হলো—রাজস্ব আয় দিয়ে এখন আর রাষ্ট্রের নিয়মিত খরচ বা পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান সম্প্রতি এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, গত অর্থবছরে শুধুমাত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, নিয়মিত বিল ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখতেই সরকারকে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোও সম্ভব হচ্ছে না। আশির দশকে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে শেষবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘সংকুচিত ফিসকাল স্পেস’ বা সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মুখে থাকা দেশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
রাজস্ব আদায়ে টান পড়ায় সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল মাত্র ১০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে সরকারের ধার বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ।













