বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস জিসিসিভুক্ত দেশগুলো বা উপসাগরীয় অঞ্চল, যেখানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের ইতিহাসে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার (৩.৭৫ বিলিয়ন) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে একক কোনো মাসে এটিই সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার রেকর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এই ঐতিহাসিক তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে দেশে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড ছিল ২০২৫ সালের মার্চে, যার পরিমাণ ছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ৪৬ কোটি ডলারের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি আরও চমকপ্রদ; মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চ মাসে পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর থাকায় প্রবাসীরা বরাবরের চেয়ে বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। তবে এবারের এই উল্লম্ফনের পেছনে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার আকর্ষণীয় হওয়া এবং সরকারের আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বাড়তি অফার বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে হুন্ডির তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের রেট এখন অনেক ক্ষেত্রে ১১৮-১২০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছানোয় প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন।
মার্চ মাসের এই রেকর্ড আয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এই খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা ২৬৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৪ কোটি ডলার এবং বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। অন্যদিকে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ছিল মাত্র এক কোটি ২০ হাজার ডলার।
তবে এই জোয়ারের মধ্যেও দেশের সাতটি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক। এছাড়া বিদেশি খাতের ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে মার্চে এক ডলার রেমিট্যান্সও আসেনি। এই ব্যাংকগুলোর প্রতি প্রবাসীদের অনাস্থা বা রেমিট্যান্স আহরণে নেটওয়ার্কের অভাবকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও মজুরি এখনো স্থিতিশীল থাকায় এই প্রবাহ বজায় রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই ধারা ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কাতারের মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রেমিট্যান্সের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে মাসে গড়ে ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসা একটি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে জনশক্তি রপ্তানির হার যদি মাসিক ৭০-৮০ হাজার থেকে নিচে নেমে আসে, তবে আগামী কয়েক বছরে এই প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। হুন্ডি প্রতিরোধে কড়াকড়ি এবং ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর রাখা গেলে সামনের কোরবানির ঈদেও রেমিট্যান্সের বড় ধরনের প্রবাহ দেখা যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।













