বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিদেশি ঋণের লাগামহীন ঘোড়া দেশকে ১১৩ বিলিয়ন ডলারের ফাঁদে আটকে ফেলেছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়ানোর প্রধান হাতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল লক্ষ্যমাত্রার ভারে নুয়ে পড়েছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ যখন আকাশচুম্বী, তখন অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রাজস্ব আদায়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই দ্বিমুখী সংকট বাংলাদেশের আর্থিক সার্বভৌমত্বকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১০৪.৩৭ বিলিয়ন ডলার, মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে তা ৯.১৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, এক বছরেই ঋণের অঙ্কে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের এক ভয়াবহ উল্লম্ফন লক্ষ করা গেছে। যদিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঋণের প্রবাহ কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলেছিল, কিন্তু বছরের শেষ তিন মাসে আবারও ১.৩০ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ যোগ হওয়ায় সেই স্বস্তি উবে গেছে। বর্তমানে সরকারি খাতের ঋণের স্থিতি ৯৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৪১.১ শতাংশ হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৫৫ শতাংশের নিচে থাকলে তাকে সহনীয় ধরা হলেও, বাংলাদেশের মূল উদ্বেগ হলো রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম হওয়া (প্রায় ৮.৫-৯ শতাংশ)। এনবিআর-এর বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিবের মতে, ঋণের এই বিশাল অঙ্ক এখনো ‘অসহনীয়’ পর্যায়ে পৌঁছায়নি; অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ঢাকা স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি সহায়তার জন্য বৈদেশিক ফান্ডের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে এসব সংস্কার কাজে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর রিজার্ভ ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এতে আর্থিক দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মহলে প্রকট হয়ে উঠতে পারে। তাই রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বাইরের ফান্ড ব্যবহারের মাধ্যমেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে এই ঋণের বোঝা বহন করছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২.৭৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের সময় এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০৪ বিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে আরও প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে।
জিডিপির তুলনায় বর্তমান ঋণ সহনীয় অবস্থায় থাকলেও অর্থনীতি এখন এক ‘ডেথ স্পাইরাল’ বা মৃত্যুচক্রে বন্দি। ১১৩.৫২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণের কিস্তি শোধ করতে সরকারকে হয় নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে, না হয় রিজার্ভে হাত দিতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে এনবিআর যে রাজস্ব আদায় করছে, তার একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ দিতে। অধ্যাপক আহসান হাবিবের মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়টি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল (Transition Phase)। যেহেতু বর্তমান নীতিনির্ধারকগণ পূর্ববর্তী প্রশাসনের চেয়ে ভিন্ন, তাই অতীতের অনেক বিতর্কিত বা দুর্বল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি মনে করেন, আগের কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার বর্তমান কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তানো উচিত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত মোট রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতি (ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ) অনুযায়ী এর পরিমাণ ২৯.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিদেশি ঋণের কিস্তি শোধের জন্য যখন অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানো অপরিহার্য, তখন এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের চিত্রটি আরও হতাশাজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। আয়কর খাতে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি এবং ভ্যাট ও আমদানি শুল্কে বিশাল ব্যবধান নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করেছে।
আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রতি বছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা। কিন্তু এনবিআরের এই করুণ দশা সেই শর্ত পূরণকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। অর্থবছরের শেষ চার মাসে এনবিআরকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যার অর্থ প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব প্রয়োজন। অথচ গত জানুয়ারিতে এনবিআর সর্বোচ্চ আদায় করেছে মাত্র ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের ঋণের বোঝা আরও ভারী করে তুলছে। লোহিত সাগরে অস্থিরতার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া—উভয়ই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এই বাড়তি খরচ মেটানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির বকেয়া বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কাছে বিশেষ ঋণের জন্য হাত বাড়াচ্ছে। নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, জ্বালানি তেল আমদানির দায় মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) বাণিজ্য অর্থায়ন শাখা আইটিএফসি-র কাছে ২.১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ঋণ চেয়েছে। ঠিক এই সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকেও তেল আমদানিতে বিশেষ অর্থায়ন সুবিধার ঘোষণা এসেছে, যা ঢাকার জন্য একটি কৌশলগত ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইটিএফসি বা এডিবির কাছ থেকে জ্বালানি কেনার জন্য নেওয়া এই বিশেষ ঋণগুলো সাময়িকভাবে সংকট সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ঋণের বোঝা আরও বাড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং এনবিআর রাজস্ব আদায়ে গতি ফেরাতে না পারলে মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও অসহনীয় করে তুলবে। রাজকোষ কার্যত তলানিতে এসে ঠেকায় সরকার এখন পুরোপুরি বিদেশি লগ্নিকারী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে বড় ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অধ্যাপক আহসান হাবিব বলেন, বৈদেশিক ঋণের সার্থকতা নির্ভর করে এর সঠিক ব্যবহারের ওপর। বিদেশ থেকে নেওয়া প্রতিটি ডলার যেন অবশ্যই উৎপাদনশীল (Productive) খাতে ব্যয় করা হয়। ঋণের অর্থ কি কেবল একটি দায় হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে আয়বর্ধক সম্পদে রূপান্তরিত হবে—তা নির্ভর করবে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর।













