দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন স্বাভাবিক রাখা এবং রপ্তানি সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আবারও রিজার্ভ থেকে ঋণের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সোমবার (৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত ১৪তম গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর একটি প্রতিনিধিদল এই প্রস্তাব পেশ করে। মূলত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।
ব্যবসায়ীদের এই দাবির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে। এফবিসিসিআই নেতাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা যাতে কাঁচামাল আমদানিতে সহজ শর্তে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পেতে পারেন, সেজন্যই ইডিএফ তহবিলের পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ডলারের বাজারে নতুন কোনো অস্থিরতা যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আগাম সতর্কতা হিসেবেই এই ঋণের আবেদন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক সময় এই ইডিএফ তহবিলের আকার ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার। করোনা-পরবর্তী সময় ও বৈশ্বিক মন্দার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় এই তহবিলের আকার বাড়িয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত এবং দেশের নিট রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এই তহবিল ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়। বর্তমানে এই বিশেষ ঋণের পরিমাণ ২.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে মনে করছে এফবিসিসিআই।
প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষ দিকে ত্রুটিপূর্ণ বিনিময় হার নীতি ও ব্যাপক অর্থ পাচারের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নজিরবিহীন ধস নামে। ২০২১ সালে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি নাগাদ আইএমএফ-এর ‘বিপিএম-৬’ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তৎকালীন সরকারের কৃত্রিম উচ্চ হিসাব প্রদর্শনের কৌশলের মাঝেও বাজারে ডলারের তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এলসি খোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে রিজার্ভ থেকে সরাসরি ডলার জোগান বন্ধ করে দিয়ে এর ক্ষয় রোধ করেন। তিনি ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া বা ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি কার্যকর করেন, যা বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহকে ত্বরান্বিত করে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভের ঝুলি পুনরায় সমৃদ্ধ করতে শুরু করে এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়।
আহসান মনসুরের এই বাজারমুখী সংস্কারের ফলে ২০২৫ সালের শুরুতে নিট রিজার্ভ পুনরায় ১৯-২০ বিলিয়ন ডলারের (বিপিএম-৬ অনুযায়ী) একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরে আসে। তাঁর সময়ে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠন ও খেলাপি ঋণ আদায়ের তৎপরতা বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৯.৮১ বিলিয়ন ডলারে এবং মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৪৩ বিলিয়ন ডলারে। মূলত গত কয়েক বছরের ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে রিজার্ভের এই সফল পুনরুদ্ধারের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসায়ীরা পুনরায় ইডিএফ ফান্ডের আকার বাড়ানোর দাবি তুলছেন।
সোমবার ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলটি জানিয়েছে, বর্তমানে রিজার্ভে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল রাখতে ইডিএফ-এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় রপ্তানিকারকদের জন্য কম সুদে ডলারের জোগান নিশ্চিত করা না গেলে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গভর্নর ব্যবসায়ীদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছেন এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে এই তহবিলের আকার বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকে ইডিএফ ছাড়াও ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। এফবিসিসিআই-এর মতে, উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা। এর জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব খাতের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সুষ্ঠু সমন্বয় জরুরি। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ঋণের খরচ কমলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “তিন মাস কেউ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাঁকে খেলাপি করা হয়। সেটা বাড়িয়ে ছয় মাস করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে যায়, সেটা বন্ধ করতে বলেছি। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল দেওয়ার পর সময় ৪ থেকে ৫ বছর দেওয়া হয়, তা বৃদ্ধি করে ১০ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে।”
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ব্যবসায়ী সমাজ। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানকার আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং এসএমই খাতের ব্যাংকিং সমস্যা দ্রুত সমাধানে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি ব্যবসায়ীবান্ধব ব্যাংকিং খাত গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।
সামগ্রিকভাবে, রিজার্ভ থেকে আবারও ঋণ চাওয়ার বিষয়টি ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানাগুলোকে পলিসি সহায়তা দেওয়া না গেলে সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। ৩.০৩ শতাংশের এই নিম্নমুখী জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্যে শিল্প ও বিনিয়োগের গতি ফেরাতে ইডিএফ-এর মতো বিশেষ তহবিলগুলো আবারও সক্রিয় করার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।













