ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি আর বৈশ্বিক অস্থিরতার যে কালো মেঘ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা অবশেষে কাটতে শুরু করেছে। দীর্ঘ মন্দার ধাক্কা সামলে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি এক শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের পথে রয়েছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আজ প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ (এডিও) অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের ৩.৫ শতাংশের নড়বড়ে প্রবৃদ্ধি পেছনে ফেলে আগামী বছরগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বাড়বে।
অর্থনীতির এই নতুন গতির নেপথ্যে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছে জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এডিবি জানাচ্ছে, নির্বাচনের পর অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি স্থবির হয়ে পড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন সরকারের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদারের উদ্যোগগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জংয়ের মতে, সরকারের এই সংস্কার এজেন্ডা বেসরকারি খাতের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সময়োপযোগী সুযোগ হিসেবে কাজ করছে।
এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে প্রবাসীদের পাঠানো শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের পুনরুত্থান। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ায় সেবা খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, অনুকূল আবহাওয়া এবং সরকারের নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তার ফলে কৃষি উৎপাদনও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপগুলোও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনের বাধাগুলো দূর হওয়ায় শিল্প উৎপাদন ২০২৬ সাল থেকে আরও শক্তিশালী হবে।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের উচ্চমূল্য এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বিঘ্নের কারণে ২০২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের মতো উচ্চস্তরে থাকতে পারে। তবে ২০২৭ সাল নাগাদ এটি কিছুটা কমে ৮.৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
এডিবি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি অনেকটা নির্ভর করছে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম এবং শিপিং খরচ আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি রাখে। সব মিলিয়ে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সংস্কার আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করেই বাংলাদেশ তার হারানো অর্থনৈতিক গৌরব পুনরুদ্ধারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।












