যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের হওয়া চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি কিছু পোশাকে শুল্ক ছাড় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।

এই চুক্তির আওতায়, ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হওয়ায় ওয়াশিংটন বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামাবে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সোশাল মিডিয়া এক্সে বলেছেন, ওয়াশিংটন “যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।”

তিনি জানান, গত বছরের এপ্রিলে শুরু হওয়া টানা নয় মাসের আলোচনার পর এই চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

চুক্তিটি ওয়াশিংটনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রীর এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।

পোশাকশিল্পই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভরকেন্দ্র। চীনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলো বাংলাদেশ।

গত বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করার পর থেকেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চালিয়ে আসছিল বাংলাদেশ।

উভয় পক্ষের যৌথ বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এই চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং উভয় বাজারেই “অভূতপূর্ব প্রবেশাধিকার” নিশ্চিত করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর শুল্কহার কমাবে এবং একই সঙ্গে দেশটির নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও বস্ত্রপণ্যকে শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেবে।

এই পণ্যের মধ্যে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম বস্ত্র উপাদান ব্যবহার করে তৈরি পোশাক। কত পরিমাণ পণ্য এই সুবিধার আওতায় আসবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হওয়া বস্ত্রের পরিমাণের ওপর।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন।

এর বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কৃষি ও শিল্পপণ্যের জন্য “উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার” দিতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউস জানায়, এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাসায়নিক পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, গাড়ির যন্ত্রাংশ, সয়াবিনজাত পণ্য এবং মাংসের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও উন্মুক্ত করা।

সোমবার ঘোষিত এই চুক্তির অংশ হিসেবে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ সংক্রান্ত মানদণ্ড, পাশাপাশি যানবাহনের নিরাপত্তা ও নির্গমনসংক্রান্ত নিয়মকানুন স্বীকৃতি দেবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ আরও সহজ হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগ জোরদার করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও জ্বালানি খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার আগের চুক্তিও বজায় রাখবে।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।

এতে বলা হয়, চুক্তিতে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, শুল্ক, উৎপত্তি বিধি, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদসংক্রান্ত স্যানিটারি ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, ইলেকট্রনিক বাণিজ্য, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষভাবে, বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য একটি বিশেষ ধারা যুক্ত হয়েছে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশের তৈরি নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা পাবে।

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের নির্বাচিত কিছু ওষুধ ও কৃষিপণ্যের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি, ডিজিটাল বাণিজ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি হয়েছে ৭৫৪ কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা মোট আরএমজি রপ্তানির প্রায় ১৯.৪৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, এই চুক্তি বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ উৎসাহ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সংযুক্তি আরও দৃঢ় করবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে স্বাগত জানানো হয়েছে।

সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর মোঃ সাইফুল ইসলামের সাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মার্কিন তুলা গুণগতভাবে উন্নত ও ব্যয়বহুল হওয়ায় স্থানীয় স্পিনাররা সুতার প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিজেএমইএ চুক্তির চূড়ান্ত শর্তাবলি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ অবহিত নয়। সরকারের কাছ থেকে বিস্তারিত নথিপত্র পাওয়ার পর বিজিএমইএ দ্রুত সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসবে। পরে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস ও ইউএসটিআর এর সাথে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করবে।

এদিকে বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে দেশটি একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সেসময় ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য ঘোষিত এই শুল্ক কমানোর ফলে বাংলাদেশ প্রায় সমপর্যায়ে পৌঁছে গেল তার প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে। বর্তমানে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশই পোশাক ও জুতা রপ্তানির পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও একে অপরের প্রতিযোগী।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প যখন প্রথম দফার পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, তখন ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তখন শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭ শতাংশ।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top